১১ জুন ২০১০। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের সকার সিটি স্টেডিয়ামে শীতের বিকেল ধীরে ধীরে সন্ধ্যায় মিশছিল। গ্যালারি ভরে গিয়েছিল রঙিন পতাকা আর উৎসুক দর্শকে। হাজার হাজার ভুভুজেলার শব্দে বাতাস কাঁপছিল। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ একসঙ্গে গাইছিল, নাচছিল। মাঠে খেলা শুরু না হলেও ইতিহাস শুরু হয়ে গিয়েছিল—প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ এসেছে আফ্রিকার মাটিতে। এটি শুধু ফুটবল টুর্নামেন্ট ছিল না, এটি ছিল একটি মহাদেশের আত্মপ্রকাশের গল্প।
বর্ণবাদ থেকে বিশ্বকাপ
দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল সংস্কৃতি বহু পুরনো, কিন্তু বর্ণবাদী শাসন দেশটিকে বিভক্ত করেছিল। কালো ও শ্বেতাঙ্গ মানুষের জীবন, সুযোগ আর স্বপ্ন আলাদা ছিল। নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগারের দীর্ঘ বছর পেরিয়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি দেখিয়েছিলেন খেলাধুলাও জাতিকে এক করতে পারে। ১৯৯৫ সালের রাগবি বিশ্বকাপ আয়োজন ছিল প্রথম বার্তা, কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপ ছিল আরও বড় স্বপ্ন। ২০০৪ সালে ঘোষণা আসে ২০১০ বিশ্বকাপ হবে দক্ষিণ আফ্রিকায়। অনেকের সন্দেহ ছিল—নিরাপত্তা, অবকাঠামো, পরিবহন নিয়ে। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা কাজ দিয়ে উত্তর দিল। নতুন স্টেডিয়াম, আধুনিক বিমানবন্দর, নতুন রাস্তা; শহরগুলো ফুটবলের ভাষায় কথা বলতে শুরু করল।
মাঠের গল্প
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ইতালি এসেছিল শিরোপা ধরে রাখতে, ফ্রান্স আগের আসরের আক্ষেপ নিয়ে, ব্রাজিল হারানো গৌরব ফেরাতে। আর্জেন্টিনার নেতৃত্বে ছিলেন কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা, এবার কোচ হিসেবে। অন্যদিকে স্পেন ইউরো জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামে। জাভি, ইনিয়েস্তা, ভিয়া, ক্যাসিয়াস—তাদের ফুটবল ছিল ধৈর্য ও সৌন্দর্যের ভাষা। গ্রুপপর্ব শুরু হতেই বিশ্বকাপ বুঝিয়ে দিল পূর্বাভাস নিরাপদ নয়। উদ্বোধনী ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার সিফিওয়ে শাবালালার গোল পুরো মহাদেশকে উল্লাসে ভাসালেও শেষ পর্যন্ত আয়োজক দ্বিতীয় পর্বে উঠতে পারেনি। তবু তারা ইতিহাসে প্রথম আফ্রিকান আয়োজক হিসেবে থেকে গেল।
ধাক্কা ও নাটক
স্পেন প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের কাছে হেরে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল, কিন্তু সেখান থেকেই শুরু হয় তাদের রূপান্তর। ফ্রান্সে কোচ-খেলোয়াড় দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে, অনুশীলন বয়কট হয়, বিশ্বকাপ শেষ হয় অপমান নিয়ে। ইতালি গ্রুপপর্বই পার হতে পারেনি। জার্মানি শুরু করে ঝড়ের গতিতে; মুলার, ওজিল, ক্লোজেরা ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। নকআউট পর্বে জার্মানি-ইংল্যান্ড ম্যাচে গোললাইন প্রযুক্তির অভাবে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। আর্জেন্টিনাকে ৪-০ গোলে হারিয়ে জার্মানি শক্তি দেখায়। ব্রাজিল কোয়ার্টার ফাইনালে নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরে বিদায় নেয়।
ফাইনাল ও শিরোপা
সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডস উরুগুয়েকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে। স্পেন জার্মানিকে ধৈর্যের ফুটবলে হারিয়ে ইতিহাসের দরজায় পৌঁছে। ১১ জুলাই ২০১০, সকার সিটি স্টেডিয়ামে ফাইনাল ছিল স্নায়ুর যুদ্ধ। ফাউল, সংঘর্ষ, চাপের লড়াইয়ে আরিয়েন রবেন একা সুযোগ পেয়েও গোল করতে পারেননি। অতিরিক্ত সময়ের ১১৬তম মিনিটে একটি পাস, একটি নিয়ন্ত্রণ, একটি শট—গোল। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হলো আনন্দে। স্পেন প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। ইনিয়েস্তা জার্সি খুলে উৎসর্গ করলেন প্রয়াত বন্ধু দানি জার্কেকে।
অমর স্মৃতি
২০১০ বিশ্বকাপ শুধু স্পেনের শিরোপা নয়, এটি প্রমাণ করেছে ছোট ছোট পাস দিয়েও বিশ্ব জয় করা যায়। ফুটবল শুধু ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার সম্পদ নয়, এটি আফ্রিকার আত্মপ্রকাশের গল্প। ভুভুজেলার শব্দ, ম্যারাডোনার অসমাপ্ত স্বপ্ন, জার্মানির ভবিষ্যতের ঘোষণা, ব্রাজিলের আক্ষেপ আর ইনিয়েস্তার অমরত্ব—সব মিলিয়ে এই বিশ্বকাপ একটি মহাদেশের উৎসব, একটি জাতির গর্ব, আর এক নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের জন্মের মহাকাব্য।



