বিশ্বকাপ ফুটবলে সমর্থকদের সহিংসতা: কুমিল্লায় প্রাণহানি, বগুড়ায় হাতাহাতি
বিশ্বকাপ ফুটবলে সহিংসতা: কুমিল্লায় প্রাণহানি, বগুড়ায় হাতাহাতি

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই বিশ্বমানবতার এক মহামিলন। চার বছর পর পর এই আয়োজন সমগ্র পৃথিবীকে যেন এক সুতোয় গাঁথিয়ে ফেলে। ভাষা, ধর্ম, বর্ণ, ভূগোল কিংবা রাজনীতির বিভাজন ভুলে কোটি মানুষ একই ভাবাবেগে শামিল হয়। বাংলাদেশে সেই উৎসবের রং অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় যেন আরো বর্ণিল। বিশেষত ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার পতাকায় ছেয়ে যায় আমাদের গ্রামগঞ্জ, শহর-বন্দর। তবে আনন্দের এই রঙের মাঝেই যখন রক্তের লালচে দাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখন দুঃখজনকভাবে উৎসবের অর্থই হয়ে পড়ে প্রশ্নবিদ্ধ।

কুমিল্লায় প্রাণহানি ও বগুড়ায় সংঘর্ষ

গতকাল কুমিল্লায় বিশ্বকাপ ফুটবল ম্যাচ দেখার সময় তর্কবিতর্কের জেরে এক সমর্থকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা যেন এই বাস্তবতাকেই আবারও স্মরণ করিয়ে দিল। শুধু কুমিল্লার ঘটনা নয়, বগুড়ায় খেলা নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে এবং তারও আগে কুষ্টিয়ায় এক সমর্থক আত্মহত্যা করেছেন বলে পত্রিকান্তরে জানা যায়। এই ঘটনাগুলোকে নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যায় না। কারণ, ২০২২ সালের বিশ্বকাপেও বাংলাদেশে ফুটবল-সম্পর্কিত কমপক্ষে ২৩টি মৃত্যুর ঘটনা, সমর্থকদের সংঘর্ষে বহু আহত ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।

ফুটবল কি বিভেদ সৃষ্টি করে?

বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনায় যখন সমগ্র বিশ্ব আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠে, তখন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বৈরিতার খেসারত হিসেবে নিভে যায় তাজা প্রাণ—ফুটবল কি আমাদের এই শিক্ষা দেয়? ফুটবল হলো মানুষের হৃদয় জয় করার খেলা; এটি ঘৃণার নয়, ভালোবাসা ও ঐক্যের ভাষা। জয়-পরাজয়কে মর্যাদার সঙ্গে গ্রহণ করা, প্রতিপক্ষকে সম্মান করা এবং নিয়মকানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা—এই মূল্যবোধই ফুটবলের প্রাণ। খেলায় একটি দল জিতবে, অন্যটি হারবে; এটাই খেলার স্বাভাবিক পরিণতি; কিন্তু সেই ফলাফলকে কেন্দ্র করে যদি বিবদমান সমর্থকদের প্রাণ পর্যন্ত ঝরে যায়, তাহলে বুঝতে হবে, সমস্যা ফুটবলে নয় বরং তা আমাদের মস্তিষ্কে, মানসিকতায়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফুটবলের ঐক্যের ইতিহাস

ফুটবলের ইতিহাসে এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যা মানবতার জয়গান গেয়েছে। ১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ চলাকালে ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলের একটি প্রদর্শনী ম্যাচ দেখার জন্য উভয় পক্ষ সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল—এটি আজও ফুটবলের ঐক্য সৃষ্টিকারী শক্তির প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হয়। ঘটনাটির ঐতিহাসিক বিবরণ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর প্রতীকী তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। একইভাবে, ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের বিভক্ত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রেও খেলাধুলা পালন করেছিল এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা। অর্থাৎ, ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—ক্রীড়া মানুষকে বিভক্ত করে না।

খেলোয়াড়দের দৃষ্টান্ত বনাম সমর্থকদের আচরণ

গভীরভাবে লক্ষণীয়, যাদের নিয়ে কোটি কোটি সমর্থকের আবেগ, সেই খেলোয়াড়রা কখনোই বিদ্বেষের শিক্ষা দেন না। খেলা শেষে তারা প্রতিপক্ষকে আলিঙ্গন করেন, অভিনন্দন জানান, পরাজিতের কাঁধে হাত রাখেন। অথচ হাজার হাজার মাইল দূরে বসে আমরা তাদের নামেই পরস্পরের বিরুদ্ধে বৈরিতায় জড়াই—এটা কি কোনো সভ্য সমর্থকের পরিচায়ক হতে পারে? বাংলাদেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার প্রতি মানুষের ভালোবাসা বিশ্বের বহু গণমাধ্যমেও আলোচিত হয়েছে। এই আবেগ আমাদের প্রাণবন্ত সংস্কৃতির অংশ বটে; কিন্তু আবেগ যখন অন্ধ উন্মাদনায় পরিণত হয়, তখন আনন্দ উৎসবের পরিবর্তে শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সহিংসতা সমাজের জন্য হুমকি

ফুটবলকে কেন্দ্র করে যে অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পায়, তা কেবল খেলার মাঠেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সমাজের সর্বস্তরেই তার প্রতিফলন দেখা যায়। আর যে সমাজ খেলাকে কেন্দ্র করে সহিংস হয়ে উঠতে পারে, সেই সমাজে মতের ভিন্নতা, রাজনৈতিক বিরোধ কিংবা সামাজিক মতপার্থক্যও সহজেই সংঘাতে রূপ নেয়। এই প্রবণতাকে কেবল ক্রীড়াজনিত উচ্ছ্বাস বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। অতএব, সংঘাত-সংঘর্ষের পরিবর্তে আমরা কি প্রকৃত মূল্যবোধের চর্চা বাড়াব না?