দেশের ফুটবলের অন্যতম আসর ‘ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ-২০২৫’-এ আটটি ম্যাচে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে যশোরকে চতুর্থ স্থানে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন জিম হোসেন। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার ও উইঙ্গার পজিশনে খেলে তিনি নিজের সেরাটা উজাড় করে দেন। তবে সেমিফাইনাল ম্যাচে ডান পায়ের হাঁটুতে আঘাত পেয়ে তাঁর লিগামেন্ট (শিরা) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু দিনমজুর কৃষক পরিবারের সন্তান জিমের পক্ষে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয়ের এই অস্ত্রোপচার করানো সম্ভব হচ্ছে না।
সাহায্যের আবেদনে সাড়া মেলেনি
জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করেও এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে জিম গত বছরের নভেম্বর থেকে মাঠের বাইরে রয়েছেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচার না হলে তাঁর ফুটবলে ফেরা সম্ভব নয়। এদিকে তাঁর পড়াশোনাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে যশোর শহরে ছাত্রাবাসে থাকা সম্ভব হয়নি। টাকার অভাবে তিনি গ্রামের বাড়ি চৌগাছায় ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
জিমের পরিচয় ও স্বপ্ন
জিম হোসেন যশোর সরকারি সিটি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি যশোরের চৌগাছা উপজেলার কেসমত খানপুর গ্রামের আক্কাস আলীর ছেলে। ২১ বছর বয়সী এই তরুণ খেলোয়াড়ের স্বপ্ন জাতীয় দলে খেলা। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্ন ক্রমেই ফিকে হয়ে যাচ্ছে।
জিম হোসেন বলেন, ‘ফুটবল খেলা আমার কাছে নেশার মতো। আঘাত পাওয়ার পর থেকে আমি নিজের চেষ্টায় চিকিৎসা করছি। প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ করে ফেলেছি। আমার বাবা দিনমজুর। ছোট এক ভাই ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। মা অসুস্থ। মায়ের ওষুধ কিনতে হয় নিয়মিত। ঠিকমতো সংসার চলে না। তার ওপরে আমার চিকিৎসার খরচ মেটানো বাবার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যে কারণে লেখাপড়াও বন্ধের উপক্রম হয়েছে। খেলার মাঠে ফেরার সম্ভাবনাও আর দেখছি না।’
সহায়তা চেয়েও ব্যর্থ
ইনজুরি হওয়ার পর কারও কাছ থেকে তেমন কোনো সাহায্য পাননি জিম। তিনি বলেন, ‘জেলা ফুটবল দলের হয়ে খেলছি। জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করার জন্য তিন দিন তাঁর দপ্তরে গিয়েছি। কিন্তু জেলা প্রশাসকের কক্ষে আমাকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পরে জেলা ক্রীড়া সংস্থার এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সুজন সরকারের সঙ্গে দেখা করে সহযোগিতার জন্য একটি লিখিত আবেদনপত্র দিয়ে এসেছি। কিন্তু দুই মাসের মধ্যে কোনো খোঁজখবর নেই। এ ছাড়া আমি যে কলেজে লেখাপড়া করছি, সেই সিটি কলেজের অধ্যক্ষ বরাবরও আবেদন করেছি। কিন্তু সেখান থেকেও কোনো সাড়া মেলেনি। এখন আমি কী করব, বুঝতে পারছি না।’
কোচের বক্তব্য
যশোর জেলা ফুটবল দলের কোচ আনোয়ার পারভেজ বলেন, ‘জিম উদীয়মানদের মধ্যে ভালো মানের খেলোয়াড়। সে ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের আটটি ম্যাচের মধ্যে সব কটিতেই খেলেছে। সেমিফাইনালে চোট লেগে তার পায়ের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেছে। চিকিৎসকেরা অপারেশন করতে বলেছে। তাকে সহযোগিতার জন্য ডিসি ও চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো সাড়া মেলেনি।’
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
যশোর জেলা প্রশাসক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে বিষয়টা আসেনি। আমি এডিসি সুজন সরকারের কাছ থেকে খোঁজখবর নিয়ে দেখছি বিষয়টা। ওই খেলোয়াড়কে সহায়তার জন্য যেখানে সুপারিশ করা লাগে, আমি করব। আমার হাতে যতটুকু সহযোগিতা করার সুযোগ রয়েছে, সেটাও করব।’
কলেজের অবস্থান
যশোর সরকারি সিটি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক মুনিবুর রহমান বলেন, ‘আমি বিষয়টা ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আসীম বাবুর কাছে শুনেছি। কিন্তু লিখিত কোনো আবেদন পাইনি। আমার কাছে ছেলেটিকে পাঠিয়ে দেন। আমি ব্যবস্থা নেব।’



