১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপ দিয়েই সূচনা হয়েছিল ৩২ দলের বিশ্বকাপের। ফ্রান্সে আয়োজন করা সেই বিশ্বকাপ আর ফরম্যাটের পরিবর্তনকে অনেকেই ধরে নেন ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী এক পরিবর্তন হিসেবে। দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন করা ফ্রান্স শুধু ফরম্যাটে নয়, পরিবর্তন এনেছিল আরও অনেক নিয়মে।
ফরম্যাটে বড় পরিবর্তন
সেবারই প্রথম অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ২৪ থেকে বেড়ে হয়েছিল ৩২। বিশ্বকাপের দলগুলোকে ভাগ করা হয় ৮ গ্রুপে। প্রতি গ্রুপের সেরা দুই দল জায়গা করে নেয় পরবর্তী পর্বে। ফলে সেরা তৃতীয় স্থানের কোয়ালিফাই করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। প্রথমবারের মতো প্রচলন হয় গোল্ডেন গোলের। নকআউট পর্বের ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে গোল ব্যবধান নয়, বরং প্রথম যে দল গোল করবে, সে দলই চলে যাবে পরবর্তী পর্বে। ইলেকট্রনিক বোর্ড ব্যবহারের অনুমতি পান ফোর্থ অফিশিয়ালরা। পেছন থেকে ট্যাকলের অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি লাল কার্ড দেওয়ারও অধিকার পান মূল রেফারি।
স্বাগতিক নির্বাচনে বিতর্ক
ফ্রান্স সেই বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পেয়েছিল কোনো যুদ্ধ না করেই। সেই বিশ্বকাপের স্বাগতিক হওয়ায় লড়াইয়ে ছিল না তেমন কেউ। সুইজারল্যান্ড নিজেদের নাম সরিয়ে নিলে বাকি থাকে শুধু মরক্কো। তাদেরকে হারিয়ে বিশ্বকাপের স্বাগতিক হয় ফ্রান্স। কিন্তু এই আয়োজনের ১৭ বছর পর উঠে আসে দুর্নীতির অভিযোগ। বিশ্বকাপ আয়োজন করার জন্য ফ্রান্স ও মরক্কো দুই দেশের কাছ থেকেই ঘুষ চেয়েছিল ফিফা। ফ্রান্স দিতে পারায় তাদের দিকেই গিয়েছে রায়।
ব্রাজিলের শক্তিশালী দল
টুর্নামেন্টের মূল আকর্ষণ ছিল ব্রাজিলের দিকেই। টানা চার বছর একই ধারায় খেলে গিয়েছে সেলেসাওরা। যুক্ত হয়েছে রোনালদো, রোনালদিনহোর মতো বড় বড় নাম। কোপা আমেরিকা, কনফেডারেশন্স কাপও তাঁদের নামের পাশেই শোভা পাচ্ছে। আর কোচ হিসেবে স্বয়ং মারিও জাগালো—ব্রাজিলের প্রতিটি বিশ্বকাপ জয়ের মিশনেই তিনি ছিলেন সঙ্গী। দুইবার খেলোয়াড়, একবার ম্যানেজার, একবার মেন্টর। এবার একেবারে কোচ। বিশ্বকাপ জেতা তাঁর কাছে বাঁ হাতের খেল। বাকি শুধু মাঠে পারফর্ম করা।
গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নরওয়ের বিপক্ষে হোঁচট খাওয়া ছাড়া ঠিকঠাকই চলছিল ব্রাজিলের বিশ্বকাপ পরিকল্পনা। চিলি, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে ব্রাজিল উঠে এসেছিল বিশ্বকাপের ফাইনালে।
ফ্রান্সের সহজ পথ
অন্যদিকে নিজেদের মাটিতে ফ্রান্স ছিল অপরাজিত। স্বাগতিক হওয়ার পুরো ফায়দাটাই তারা নিয়েছিল। গ্রুপ পর্বে ডেনমার্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব। নক আউটে প্যারাগুয়ে। সহজেই সবটা কাটিয়ে এসেছিল ফ্রান্স। কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালি আর সেমিতে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে ফাইনালের পথ ধরে ফরাসিরা। পুরো বিশ্বকাপে মাত্র ২ গোল হজম করেন ফ্রান্সের গোলরক্ষক বার্থেজ। তার একটা আবার সেমিফাইনালে এসে। স্বাগতিক হওয়ার পূর্ণ সুবিধাটা কাজে লাগিয়েছিল ফ্রান্স। কারণ, বিশ্বকাপের স্বাগতিকের সঙ্গে সঙ্গে ড্রতেও কারসাজি করা হয়েছিল। বিশ্বকাপের ড্র এমনভাবে করা হয়েছিল যে ফাইনালের আগে যাতে ফ্রান্স ও ব্রাজিল মুখোমুখি হতে না পারে। যাতে সহজেই নিজেদের মাটিতে ফ্রান্স অন্তত বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলতে পারে।
রোনালদোর অসুস্থতা
ফাইনালের আগের দিন বাধে বিপত্তি। হোটেলে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন রোনালদো। সবে ২১ বছরে পা দিয়েছেন, তখনই বিশ্বের সেরা তারকাদের একজন। ব্রাজিলের আক্রমণভাগের অন্যতম সেরা অস্ত্র তিনি। ফাইনালের আগের দিন এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। সেখান থেকে শুধু ফাইনাল খেলতেই হাসপাতাল ছাড়লেন তিনি। সরাসরি যোগ দিলেন দলের সঙ্গে ফাইনালে।
ফাইনালে ফ্রান্সের জয়
রোনালদোর এমন ইঞ্জুরি সবার মনেই চিন্তার খোরাক জন্ম দিয়েছিল। ব্রাজিল দলও বিমর্ষ হয়ে পড়েছিল। আর সে সুযোগটা হারায়নি ফ্রান্স। একেবারে শুরু থেকেই ব্রাজিলের টুঁটি চেপে ধরে দেশমের দল। বিশেষ করে জিনেদিন জিদান। বিশ্বকাপের প্রথম দিন থেকে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা জিদানকে থামানোর সাধ্য ছিল না কারোরই। সেখানে রাতারাতি বিপর্যস্ত ব্রাজিল দলকে পেয়ে আরও জ্বলে ওঠেন তিনি। জিদানের দুই গোল আর ম্যাচের শেষ মিনিটে পেতিতের গোলে ৩-০ গোলে জয় নিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরে ফ্রান্স। ফিফার জন্মস্থান ফ্রান্সে প্রথমবারের মতো ভেড়ে বিশ্বকাপ ট্রফি।



