গোলরক্ষকরা যেভাবে গোল করে ইতিহাস গড়েছেন
গোলরক্ষকরা যেভাবে গোল করে ইতিহাস গড়েছেন

গোলরক্ষকদের গোল করার ঐতিহ্য

ফুটবল মাঠে একজন গোলরক্ষক দলের ভরসা, গোলপোস্টের প্রহরী। তাঁর কাজ প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানো, গোল বাঁচানো এবং প্রয়োজনে আক্রমণে সাহায্য করা। সাধারণত গোলরক্ষকের নাম আলোচনায় আসে দুর্দান্ত কোনো সেভ, পেনাল্টি ঠেকানো কিংবা ম্যাচ বাঁচানো পারফরম্যান্সের জন্য। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে এমন কিছু গোলরক্ষক ছিলেন, যাঁরা এই প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছেন। গোল ঠেকানোর পাশাপাশি দলের জন্য করেছেন গোল।

ফুটবলের ইতিহাসে গোলরক্ষকদের গোল করার ঘটনা একেবারে অস্বাভাবিক নয়। মাঝে মাঝে কোনো কর্নার কিকের সময় ম্যাচের শেষ মুহূর্তে গোলরক্ষক প্রতিপক্ষের বক্সে উঠে আসেন, আবার কখনো দূরবর্তী কোনো কিক বাতাসের গতিপথ বদলে প্রতিপক্ষের জালে জড়িয়ে যায়।

রোজেরিও সেনি: সর্বোচ্চ গোল করা গোলরক্ষক

ব্রাজিলের ক্লাব সাও পাওলো এফসির গোলরক্ষক ছিলেন রোজেরিও সেনি। ব্রাজিলের এই কিংবদন্তি গোলরক্ষক পেশাদার ক্যারিয়ারে ১৩০টিরও বেশি গোল করে এমন এক রেকর্ড গড়েছেন, যা আজও কোনো গোলরক্ষক ভাঙতে পারেননি। তাঁর অধিকাংশ গোল এসেছে ফ্রি-কিক ও পেনাল্টি থেকে। ফ্রি-কিক নেওয়ার সময় তাঁর নিখুঁত শট, বলের গতিপথ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস ছিল মুগ্ধ করার মতো। অনেক সময় প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়েরা ভুলেই যেতেন যে তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন গোলরক্ষক, কোনো স্ট্রাইকার নন। যখন কোনো গোলরক্ষক নিজের বক্স ছেড়ে মাঠের মাঝ দিকে এগিয়ে যান, তখন সাধারণত দর্শকদের মনে শঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু রোজেরিও সেনির ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। তিনি সামনে এগিয়ে এলেই দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত। কারণ সবাই জানত, এবার হয়তো গোল করতে যাচ্ছেন দলের গোলরক্ষকই। ফুটবলের ইতিহাসে এমন দৃশ্য খুব কমই দেখা গেছে, যেখানে গোলরক্ষকের ফ্রি-কিক নেওয়া দেখার জন্য দর্শকেরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সাও পাওলোর গোলরক্ষক রোজেরিও সেনির গল্প শুধু গোলসংখ্যাতেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দেখিয়েছিলেন যে একজন খেলোয়াড়ের অবস্থান তার সামর্থ্যের সীমা নির্ধারণ করে না। ফুটবলের অগণিত বিস্ময়ের মধ্যে তাঁর খ্যাতি আজও অনন্য। অনেকেই তাঁকে, ‘ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক গোলরক্ষক’ বলে থাকেন।

হোসে লুইস চিলাভার্ট: হ্যাটট্রিক করা গোলরক্ষক

তবে সেনি একা নন। ফুটবল ইতিহাসে আরও কয়েকজন গোলরক্ষক নিজেদের গোল করার দক্ষতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক হোসে লুইস চিলাভার্ট। ফ্রি-কিক ও পেনাল্টি থেকে অসংখ্য গোল তো করেছেনই, এক ম্যাচে হ্যাটট্রিকও করেছিলেন। আর্জেন্টিনার ঘরোয়া লিগে খেলতেন চিলাভার্ট। ভেলেজ সার্সফিল্ডের হয়ে ফেরো কারিল ওমেস্তের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছিলেন চিলাভার্ট। একজন গোলরক্ষকের হ্যাটট্রিক—এমন ঘটনা ফুটবলজগতে প্রায় রূপকথার মতো শোনায়। গোলপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ম্যাচ বাঁচানোর পাশাপাশি গোল করার এমন ক্ষমতা তাঁকে ফুটবলের ইতিহাসে এক অন্য স্থানে নিয়ে গেছে।

হান্স-ইয়র্গ বুট: চ্যাম্পিয়নস লিগে তিন দলের হয়ে গোল

আধুনিক ফুটবলেও এই ধারা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। জার্মানির হান্স-ইয়র্গ বুট ছিলেন এমন একজন গোলরক্ষক। তিনিও নিয়মিত পেনাল্টি নিতেন। ক্যারিয়ারজুড়ে অসংখ্য গোল করেছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে দলের জন্য নির্ভরযোগ্য গোলদাতার ভূমিকাও পালন করেছেন। যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি পেনাল্টি স্পটের সামনে দাঁড়াতেন, তা অনেক স্ট্রাইকারকেও হার মানাত। তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম অনন্য রেকর্ডটি হলো, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে তিনটি ভিন্ন দলের হয়ে গোল করেছেন হান্স। জার্মান ক্লাব হামবুর্গ, লেভারকুসেন এবং বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৩টি গোল করেছেন তিনি। মজার ব্যাপার হলো, তিনবারই গোল হজম করা প্রতিপক্ষ ছিল ইতালির ক্লাব জুভেন্টাস।

আলিসন বেকার: আধুনিক উদাহরণ

আরও সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক আলিসন বেকার একই ধরনের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্তের জন্ম দিয়েছেন। ২০২১ সালে ওয়েস্ট ব্রমউইচ অ্যালবিয়নের বিপক্ষে গোল করেছিলেন বেকার। লিভারপুল সতীর্থ ট্রেন্ট আলেকজান্ডার-আর্নল্ডের কর্নার কিক থেকে চমৎকার হেডে লিভারপুলকে ২-১ ব্যবধানে জয় এনে দেন ব্রাজিলের এই গোলরক্ষক। এই জয় সে বছর উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে কোয়ালিফাই করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে নেওয়া কর্নার কিক থেকে হেড দিয়ে গোল করেন তিনি। গোল করার পর তাঁর উচ্ছ্বাস এবং দলের খেলোয়াড়দের উদ্‌যাপন ফুটবলপ্রেমীদের মনে আজও গেঁথে আছে।