গোল্ডেন গোল: ফুটবলের সেই সাডেন ডেথ নিয়মের কাহিনি
গোল্ডেন গোল: ফুটবলের সাডেন ডেথ নিয়মের ইতিহাস

ফুটবল কি শুধু ৯০ মিনিটের খেলা? ৯০ মিনিটের দক্ষতা বটে, কিন্তু ৯০ মিনিট পার হলেই ফুটবল হয়ে ওঠে ভাগ্য আর আত্মবিশ্বাসের খেলা। একটি ভুল করলেই পা ফসকানো আর শিরোপাকে বিদায় বলে দেওয়া। নব্বইয়ের দশকে এমনই এক আতঙ্কের নাম ছিল ‘গোল্ডেন গোল’। ৯০ মিনিটের খেলা শেষ হলেই শুরু হতো অতিরিক্ত ৩০ মিনিটের ম্যাচ। কিন্তু সেই ম্যাচ সব সময় ৩০ মিনিট হতো না, যখনই এক দল গোল করত, ম্যাচ সেখানেই শেষ হতো।

এমন এক ‘সাডেন ডেথ’ নিয়ম চালু হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোয় যখন ফলাফল পাওয়া যেত না, তখনই অতিরিক্ত সময়ের নিয়ম আসে। সরাসরি টাইব্রেকারে না গিয়ে দুই দলকে আরেকটু সময় দেওয়া হতো ম্যাচের ফলাফল বের করার জন্য। কিন্তু সেখানেও একটা শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। যে দল আগে গোল করতে পারবে, সেই দলই পরবর্তী পর্বের টিকিট কাটবে। গোল হলেই ম্যাচ শেষ।

গোল্ডেন গোলের সূচনা

এই নিয়মের সূচনা হয়েছিল ম্যাচের উত্তেজনা বাড়াতে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেখা যাচ্ছিল, নকআউট পর্বের ম্যাচগুলো অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে দলগুলো খুব রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ত। গোল খাওয়ার ভয়ে কেউ আক্রমণ করত না, সবাই চাইত ম্যাচটি টাইব্রেকারে নিয়ে যেতে। ফুটবলকে আরও রোমাঞ্চকর করতে ১৯৯৩ সালে ফিফা ‘গোল্ডেন গোল’ নিয়মটি চালু করে। নিয়মটা একেবারেই সোজা। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে যে দল আগে গোল করবে, ম্যাচ সেখানেই শেষ এবং সেই দলই জয়ী।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বিশ্বকাপের মূল পর্বে সব সমীকরণ পরিবর্তন করে দেয় ‘গোল্ডেন গোল’। ১৯৯৮ ও ২০০২—দুই বিশ্বকাপে দেখা মিলেছিল এই নিয়মের। দুই আসরে গোল্ডেন গোলের দেখা মিলেছে মাত্র চারবার। সেই চার ম্যাচের গল্পই বলব।

লরঁ ব্লাঁ: ফ্রান্স বনাম প্যারাগুয়ে, রাউন্ড অব সিক্সটিন, ১৯৯৮ বিশ্বকাপ

বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম গোল্ডেন গোল করেছিলেন ফ্রেঞ্চ ডিফেন্ডার লরঁ ব্লাঁ। শেষ ১৬-তে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১১৪তম মিনিটে গোল করে ফ্রান্সকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আন জুং-হোয়ান: দক্ষিণ কোরিয়া বনাম ইতালি, রাউন্ড অব সিক্সটিন, ২০০২ বিশ্বকাপ

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ম্যাচ ধরা হয় এটিকে। স্বাগতিক দলকে জেতাতে রেফারি সেদিন বিতর্কিত অনেক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে। ইতালির খেলোয়াড়দের রীতিমতো কনুই মেরেও কোনো কার্ড দেখেনি দক্ষিণ কোরিয়ার খেলোয়াড়েরা। নির্ধারিত সময় ১-১ গোলে ড্র হওয়ার পর ১১৭তম মিনিটে জুং-হোয়ানের হেডে করা গোল্ডেন গোলে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটে দক্ষিণ কোরিয়া।

হেনরি কামারা: সেনেগাল বনাম সুইডেন, রাউন্ড অব সিক্সটিন, ২০০২ বিশ্বকাপ

সেনেগালের রূপকথা–যাত্রায় নতুন এক মাত্রা যোগ করেছিল হেনরি কামারার গোল। নির্ধারিত সময় ১-১ গোলে শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত সময়ে ১০৪ মিনিটে গোল করে সেনেগালকে প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছিলেন কামারা।

ইলহান মানসিজ: তুরস্ক বনাম সেনেগাল, কোয়ার্টার ফাইনাল, ২০০২ বিশ্বকাপ

সেনেগালের রূপকথা শুরু হয়েছিল গোল্ডেন গোল দিয়ে, শেষও হয়েছে ঠিক সেভাবেই। পরবর্তী রাউন্ডেই সেনেগাল বাদ পড়ে এই গোল্ডেন গোলে। ০-০ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে একমাত্র গোল করেন ইলহান মানসিজ। সেদিন অতিরিক্ত সময় চলেছিল মাত্র ৪ মিনিট। ৯৪ মিনিটে গোল করে তুরস্ককে প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে নিয়ে গিয়েছিলেন মানসিজ।

গোল্ডেন গোলের অবসান

২০০৪ সালেই এই নিয়ম বাতিল ঘোষণা করে ফিফা। কারণ, ফিফা যে উদ্দেশ্যে নিয়মটি এনেছিল, ফলাফল হয়েছিল তার উল্টো। গোল করার চেয়ে গোল ‘না খাওয়া’র আতঙ্কে দলগুলো আরও বেশি রক্ষণাত্মক খেলা শুরু করে। কারণ, একটি ছোট ভুল মানেই পুরো বিশ্বকাপ থেকে বিদায়। ফলে অতিরিক্ত সময়ের খেলাগুলো হয়ে উঠেছিল বিরক্তিকর।