২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের ভিসানীতি নিয়ে নানা বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সোমালিয়ার এক রেফারিকে মিয়ামি বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়া, ইরান ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের ভিসা না পাওয়া এবং ইরান জাতীয় দলের প্রশিক্ষণ শিবির মেক্সিকোতে সরিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনাগুলো বিশ্বকাপ আয়োজনকে ঘিরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা
সমালোচকদের মতে, এসব সমস্যার ইঙ্গিত অনেক আগেই দেখা গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে প্রথম দিনই ‘Protecting the American People Against Invasion’ শিরোনামে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। পরে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিছু দেশের নাগরিকদের জন্য ব্যবসা বা পর্যটক ভিসার ক্ষেত্রে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত বন্ড জমার শর্ত আরোপ করা হয়। এছাড়া ৭৫টি দেশের নাগরিকদের অভিবাসন ভিসা আবেদনও স্থগিত রাখা হয়।
এমন বাস্তবতায় বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ভিসা জটিলতা দেখা দেওয়াকে অনেকেই অস্বাভাবিক মনে করছেন না। তবে দীর্ঘদিন ধরে এসব উদ্বেগকে গুরুত্ব দেননি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ২০২৫ সালে প্যারাগুয়েতে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্বকে আমেরিকায় স্বাগত জানানো হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘খেলোয়াড়, সংশ্লিষ্ট সবাই এবং অবশ্যই সমর্থকরা স্বাগত। এটা শুধু আমার কথা নয়, এটা মার্কিন সরকারের অবস্থান।’
ইনফান্তিনোর আশ্বাস ও বাস্তবতা
একই বছরের গ্রীষ্মে কেনিয়ায় এক দক্ষিণ আফ্রিকান সাংবাদিক ইনফান্তিনোকে বলেন, ‘আমরা এমন একটি দেশে খেলতে যাচ্ছি যেখানে আমাদের অনেকেই নিজেদের স্বাগত মনে করি না। আফ্রিকা ও বিশ্বের অন্যদের যেন বহিরাগত বা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আপনার।’ জবাবে ফিফা সভাপতি বলেন, ‘এ বিষয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। আগামী বছরের বিশ্বকাপে কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে সবাইকে স্বাগত জানানো হবে। যোগ্যতা অর্জনকারীরা তাদের সমর্থকদের নিয়ে আসতে পারবেন।’
বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নীতির বিষয় এবং এর জন্য সরাসরি ফিফাকে দায়ী করা যায় না। তবে ইনফান্তিনোর বারবার দেওয়া আশ্বাস এবং অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এখন ফিফাকে অস্বস্তিকর অবস্থায় ফেলেছে। কাতার বিশ্বকাপের সময়ও তিনি স্বাগতিক দেশের পক্ষ থেকে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এবারও একই কৌশল নিয়েছেন।
ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্বের কোনো রাজনৈতিক নেতার চেয়ে বেশি বার হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে দেখা গেছে ইনফান্তিনোকে। ট্রাম্পের অভিষেকের আগের সমাবেশে তিনি রিপাবলিকানদের প্রতীকী লাল টাই পরেন। মার-আ-লাগো সফর করেন এবং ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প যা করছেন, আমেরিকানদের তা সমর্থন করা উচিত, কারণ বিষয়টি ভালো দেখাচ্ছে।’
শুধু তাই নয়, নিউইয়র্কের ট্রাম্প টাওয়ারে ফিফা অফিসও খোলা হয়েছে। ফলে ফিফা সরাসরি ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায় ভাড়া দিচ্ছে। বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানের স্থানও শেষ মুহূর্তে লাস ভেগাস থেকে সরিয়ে ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টারে নেওয়া হয়, যেখানে ট্রাম্পপন্থিদের প্রভাব ছিল। এসব কারণে সমালোচকদের প্রশ্ন, এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার পরও এখন ফিফা কীভাবে দাবি করে যে তারা কেবল একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজক এবং ভিসা সমস্যার বিষয়ে তাদের কিছু করার নেই?
ভিসা জটিলতার ইতিহাস
ফিফার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা অবশ্য ট্রাম্প আমলেই শুরু হয়নি। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়েও এ নিয়ে উদ্বেগ ছিল। বিশ্বকাপের আয়োজক শহরগুলো ও পর্যটন খাতের প্রতিনিধিরা দীর্ঘ ভিসা সাক্ষাৎকারের অপেক্ষা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। পরে কংগ্রেস ৫ কোটি ডলার বরাদ্দ দিয়ে সেই জট কমানোর উদ্যোগ নেয়।
কাতার বিশ্বকাপে দর্শকদের জন্য ‘হায়া কার্ড’ ব্যবস্থার মতো একটি বিশেষ সুবিধা ২০২৬ বিশ্বকাপেও চালু করতে চেয়েছিল ফিফা। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো মিলিয়ে একটি অভিন্ন ভিসা ব্যবস্থার প্রস্তাবও গ্রহণ করা হয়নি। ফলে তিনটি দেশের জন্য আলাদা প্রবেশ নীতি বহাল আছে।
ফিফা পাস ও সীমিত সাফল্য
ফিফা কিছু সাফল্যের দাবি করলেও সেগুলোর প্রভাব ছিল সীমিত। ‘ফিফা পাস’ নামে একটি ব্যবস্থা চালু করা হয়, যার মাধ্যমে সমর্থকেরা দ্রুত ভিসা সাক্ষাৎকারের সুযোগ পেতে পারেন। তবে এটি ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাত্র প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই সুবিধা ব্যবহার করেছিলেন। এদিকে বিশ্বকাপের টিকিটধারীদের জন্য কিছু দেশের নাগরিকদের ভিসা বন্ড মওকুফ করার ঘোষণা দেওয়া হলেও শর্ত ছিল কঠোর। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টিকিট কেনা এবং ফিফা পাসে নিবন্ধন করা ব্যক্তিরাই শুধু এ সুবিধা পান। তাই বাস্তবে উপকৃত হয়েছেন খুব অল্পসংখ্যক সমর্থক।
সোমালিয়ার রেফারির ঘটনা
তিন দিন আগে মিয়ামিতে বিশ্বকাপের রেফারিদের উদ্দেশে ইনফান্তিনো বলেছিলেন, ‘আমরা আপনাদের জন্য সেরা পরিবেশ ও সেরা সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে চাই। আমি আপনাদের পাশে আছি। আমরা আপনাদের সমর্থন করব।’ কিন্তু একই দিনে সোমালিয়ার রেফারি ওমর আবদুলকাদির আরতান মিয়ামিতে পৌঁছে মার্কিন সীমান্ত কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত দেশে প্রবেশের অনুমতি পাননি।
বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্স পরিচালক অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি বলেন, ‘সীমান্ত কর্তৃপক্ষ সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে।’ অন্যদিকে নিউইয়র্ক টাইমসকে আরতান বলেন, ‘আমার কাছে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ছিল। আমার বৈধ ভিসাও ছিল।’ ঘটনার বিস্তারিত এখনও পরিষ্কার নয়। তবে ফিফার প্রতিক্রিয়া ছিল সংক্ষিপ্ত। এ ঘটনায় ফিফার এক মুখপাত্র বলেন, ‘স্বাগতিক দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ফিফা জড়িত নয়। আগের টুর্নামেন্টগুলোর মতোই কোনো ব্যক্তিকে ভিসা দেওয়া হবে কিনা এবং তাকে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে কিনা, সে সিদ্ধান্ত স্বাগতিক দেশের সরকারের।’
এসব প্রশ্নের মুখে ফিফা সভাপতিকে খুব কমই গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দিতে দেখা গেছে। বিশ্বকাপের টিকেট বিতর্ক, স্টেডিয়ামে পানির বোতল নেওয়ার বিধিনিষেধ, উচ্চ পরিবহন খরচ কিংবা দর্শকদের জন্য অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে জায়ান্ট স্ক্রিনে নাম প্রদর্শনের মতো বিষয়েও তিনি নীরব থেকেছেন।



