ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি মেলা: বিনিময় প্রথা থেকে মুদ্রার যুগে উত্তরণ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শুঁটকি মেলা: বিনিময় প্রথার বিবর্তন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পহেলা বৈশাখে ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি মেলার আয়োজন

বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী হাওর অঞ্চলের বাসিন্দারা বুধবার (১৫ এপ্রিল) পহেলা বৈশাখ উদযাপন করছে। এই উপলক্ষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার সদর ইউনিয়নের কুলিকুন্ডা গ্রামে বসেছে ঐতিহাসিক শুঁটকি মেলা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত ক্রেতা-বিক্রেতাদের সমাগমে মুখরিত হয়ে উঠেছে মেলা প্রাঙ্গণ।

প্রাচীন বিনিময় প্রথার বিবর্তন

এই মেলায় ঐতিহ্যগতভাবে বিনিময় প্রথায় শুঁটকি বিক্রি হতো, যা এখন বিলুপ্তির পথে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নাসিরনগরের জেঠাগ্রাম গ্রামের নাফিজা চৌধুরী প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী শুঁটকি নিয়ে মেলায় অংশ নিয়েছেন। তিনি জানান, গত দুই দশক ধরে তিনি এই মেলায় আসছেন এবং আলু, বেগুন, ঢ্যাঁড়স, মিস্টি আলু, সিমের বিচিসহ সদ্য তোলা ফসলের বিনিময়ে শুঁটকি বিক্রি করছেন। তবে কালের পরিবর্তনে মেলার জৌলুস কমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নাফিজা চৌধুরী বলেন, "আগে মানুষ সদ্য তোলা ফসল দিয়ে বিনিময় করতেন, কিন্তু এখন শুঁটকির দাম বেড়ে যাওয়ায় এবং সবজির দাম কমে যাওয়ায় আর আগের মতো বিনিময় হয় না। তবুও ঐতিহ্য রক্ষায় আমি অংশগ্রহণ করেছি।"

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মোগল আমল থেকে চলে আসা ঐতিহ্য

মেলায় আসা ক্রেতা ইলিয়াস মিয়া দাবি করেন, এই মেলা তাদের বাপ-দাদাসহ চার পুরুষ ধরে চলে আসছে এবং এর বয়স কমপক্ষে ৪০০ বছর। তিনি বলেন, "মোগল আমলে কড়ির প্রচলন ছিল, তখন কুলিকুন্ডা গ্রামের মানুষ ধান, আলু, সইয়ের দানা (সিমের বিচি), তরিতরকারি বদলে শুঁটকি নিতো। মুদ্রার প্রচলন হওয়ার পর শুঁটকির মূল্য বেড়েছে, ফলে বিনিময় প্রথা কমেছে, কিন্তু এখন টাকায় বিপুল বেচাকেনা হয়।"

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ব্যবসায়ীদের সাফল্য ও দামের হালচাল

সুনামগঞ্জ থেকে শুঁটকি মাছ নিয়ে আসা সুবল চন্দ্র দাস জানান, হাওর থেকে ধরা বোয়াল, আইর, শোল, গজার মাছের শুঁটকিসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের শুঁটকি নিয়ে এসেছেন। মেলা শুরু হওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে তিনি ৩৫ হাজার টাকার বিক্রি করেছেন। বিক্রেতা রবি দাসের তথ্যমতে, মেলায় প্রতি কেজি বোয়াল ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা, কাইক্কা ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, কাঁচকি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা, শোল ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা এবং বাইম মাছের শুঁটকি ১৬০০ থেকে ১৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছু দোকানে সামুদ্রিক মাছের শুঁটকিও পাওয়া যাচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শুঁটকি ব্যবসায়ী নিখিল দাস বলেন, "মেলার জন্য আগে থেকে বড় মাছের শুঁটকি সংগ্রহ করে রাখি, কারণ এখানে ক্রেতারা প্রচুর কেনেন। লাভের আশা করছি।"

মেলার বিস্তারিত ও আয়োজনের প্রত্যাশা

মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য ওহাব আলী জানান, একসময় ফসলের বিনিময়ে পণ্য বিনিময় হলেও মুদ্রা প্রচলনের পর এর জৌলুস কমেছে। বর্তমানে টাকায় বেচাকেনা হয়। তিনি উল্লেখ করেন, মেলায় চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, কুমিল্লা, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ থেকে ব্যবসায়ীরা শুঁটকি নিয়ে এসেছেন, যেখানে বোয়াল, গজার, শোল, বাইম, পুঁটি, টাকি, কাইক্কা ও টেংরাসহ দেশীয় প্রজাতির মাছের শুঁটকি প্রাধান্য পাচ্ছে।

মেলায় শুঁটকি ছাড়াও স্থানীয় কুমারদের হাতের তৈরি হাঁড়ি, পাতিল, কলস, ঝাঁঝর, থালা, ঘটি, বদনা, বাটি, পুতুল ও প্রদীপসহ নানা সামগ্রী বিক্রি হচ্ছে। মেলা সম্পূর্ণ ইজারা মুক্ত এবং দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীদের হয়রানি রোধে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।

মেলা পরিচালনা কমিটির তথ্যমতে, দুই দিনের এই মেলায় চার শতাধিক দোকানি পসরা সাজিয়ে বসেছে এবং আয়োজকরা পাঁচ কোটি টাকার পণ্য বিক্রির আশা করছেন।