ব্রহ্মপুত্র নদ বাঁচাতে বৈশাখী অনুষ্ঠানে কবিতা-গানে প্রতিবাদ
ময়মনসিংহ নগরের কাচারিঘাট এলাকার ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে জেগে ওঠা চরে মঙ্গলবার বৈশাখের ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়। পরম্পরা নামের একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, যেখানে কবিতা, গান ও কথায় ব্রহ্মপুত্র নদকে বাঁচানোর আকুতি ও প্রতিবাদ জানানো হয়। গ্রামীণ আবহে সজ্জিত চরটিতে পুঁতে রাখা বাঁশে কাগজের চরকি লাগানো হয় এবং সুতায় রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো হয়।
নদের রুগ্ণদশা তুলে ধরার চেষ্টা
অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় সাত বছর আগে শুরু হওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের খননকাজের রুগ্ণদশা তুলে ধরা হয়। পানিতে পুঁতে দেওয়া তালপাতায় ‘বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে’ লেখা দেখা যায়, যা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাকে উপজীব্য করে। ককসিট দিয়ে তৈরি একটি গরু হাঁটুজলে স্থাপন করে ব্রহ্মপুত্রের দুরবস্থা চিত্রিত করা হয়।
ব্রহ্মপুত্রের জেলে আজিজুল হক অনুষ্ঠানের সূচনা করে বলেন, ‘আমাদের আগের ব্রহ্মপুত্র আর নেই। এই নদের কী পরিমাণ মাছ পাওয়া যেত আর এখন সারা দিন জাল ফেলেও মাছ মেলে হাতে গোনা। আমরা আগের ব্রহ্মপুত্র ফেরত চাই।’
সংগঠনের সভাপতির বক্তব্য
পরম্পরার সভাপতি শামীম আশরাফ বলেন, ‘ময়মনসিংহের মানুষের জন্য ব্রহ্মপুত্র হচ্ছে প্রাণকেন্দ্র। দীর্ঘ সময় ধরে খননকাজ চললেও কাজের কাজ হচ্ছে না। বরং ব্রহ্মপুত্রের মাঝখানে চর জেগে উঠছে আরও বেশি। তাই ব্রহ্মপুত্রের বুকের চরেই আমরা বৈশাখী উৎসব পালন করি।’ উল্লেখ্য, সংগঠনটি ২০২৩ সালে ‘মৃতের চিৎকার’ শিরোনামে ব্রহ্মপুত্র নদ বাঁচাতে ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছিল।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের মতামত
জেগে ওঠা চরেই কবিতা আবৃত্তি, গান ও কলাপাতায় পান্তা খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। আন্দোলনকর্মী মমিনুর রহমান বলেন, ‘দেশে দুর্নীতি করতে করতে সবকিছু খেয়ে ফেলছে, বাকি শুধু নদী। এটাও প্রায় শেষ পর্যায়ে। নদী যেন বাঁচে, সে জন্যই বৈশাখী আয়োজনের ভেতর দিয়ে আমাদের প্রতিবাদ।’
অনুষ্ঠানে কবি শরৎ সেলিম কবিতা পড়েন এবং লেখক সীমান্ত জসিম, কবি ফাহিম ফারুক প্রমুখ বক্তব্য দেন।
খনন প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রিতা ও সমালোচনা
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ২ হাজার ৭৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের খননকাজ করছে। গাইবান্ধা, জামালপুর, ময়মনসিংহ, শেরপুর ও কিশোরগঞ্জ—এই পাঁচ জেলায় নদের ২২৭ কিলোমিটার অংশ খনন করার কথা। ২০১৯ সালের জুন থেকে শুরু হওয়া এ প্রকল্প ২০২৪ সালে জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু কাজ শেষ না হওয়ায় সময় প্রথম দফায় ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মহসিন মিয়া জানান, ইতিমধ্যে প্রকল্পটির ৪৬ শতাংশ কাজ হয়েছে। তবে খননের সুফল মিলছে না ব্রহ্মপুত্র-যমুনার উৎসমুখ গাইবান্ধা ও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা খনন না করতে পারায়। তিনি বলেন, ‘উৎসমুখ খনন করতে না পারলে কোনো সুফল আসবে না ব্রহ্মপুত্রে।’
এই দীর্ঘসূত্রিতা ও অকার্যকরতার সমালোচনা করে স্থানীয়রা ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নদী বাঁচাতে সচেতনতা ও প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে।



