বিশ্বের নববর্ষ উৎসব: বাংলা ও ইরানের ঐতিহ্যের মিল ও সংগ্রামের গল্প
বিশ্বজুড়ে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করা হলেও বিভিন্ন জাতির রয়েছে নিজস্ব সাল গণনার রীতি ও পঞ্জিকা। একদিকে জাগতিক তাগিদ, অন্যদিকে প্রাণের শান্তি খোঁজার এই দ্বন্দ্বে নববর্ষ উৎসবগুলো হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। চীনা নববর্ষ, ইরানের নওরোজ ও বাংলা নববর্ষ—এই তিনটি উৎসবের মধ্যে রয়েছে গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সাদৃশ্য, যা মানবজাতির অমূর্ত ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত।
চীনা নববর্ষ: বিশ্বব্যাপী প্রভাব ও অর্থনৈতিক শক্তি
চান্দ্র-সৌরপঞ্জিকা অনুসারে জানুয়ারির শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে চীনা নববর্ষ পালিত হয়। লন্ঠন উৎসব বা আলোর উদ্ভাসন এই উৎসবের অঙ্গাঙ্গি অংশ। তবে চীনা নববর্ষের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বিশাল বাণিজ্যিক প্রভাব। ধনবান চীন দেশের নববাণিজ্যের অভিঘাত দুনিয়াজুড়ে অনুভূত হয়, যেখানে পাশ্চাত্যের শহরগুলো চীনা ট্যুরিস্টদের জন্য প্রস্তুত থাকে। ইউনেসকো চীনা নববর্ষকে মানবজাতির অমূর্ত ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা কনফুসিয়ান, বৌদ্ধ, তাওবাদীসহ সব ধর্মের মানুষ সমভাবে উদযাপন করে।
বাংলা নববর্ষ: ফসলের মৌসুম ও জাতিসত্তার প্রতীক
বাঙালির নিজস্ব বর্ষগণনার রীতি ইতিহাসের পরম্পরায় জীবনের অঙ্গাঙ্গি অংশ। চীনা নববর্ষের মতো বাংলা সাল গণনাও ফসল কাটার মৌসুমের সঙ্গে জড়িত। মোগল সম্রাট আকবর রাজজ্যোতিষীদের সাহায্যে বঙ্গাব্দের পঞ্জিকা প্রবর্তন করেন, যেখানে চান্দ্র ও সৌরপঞ্জিকা একত্রিত হয়েছে ইসলামি-হিন্দুয়ানির মিলনে। বিভিন্ন ধর্মানুসারীরা বাংলা নববর্ষকে অভিন্ন জাতিসত্তার উৎসব হিসেবে পালন করে, পাশাপাশি বিহু, সাংক্রাইনের মতো ভিন্ন জাতিসত্তার উৎসবও উদযাপিত হয়।
ইরানের নওরোজ: তিন হাজার বছরের সভ্যতার উত্তরাধিকার
পারস্য বা ইরানের নওরোজ উৎসব মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে পালিত হয়, যা ইউনেসকোর স্বীকৃতি পেয়েছে। জরথুস্ত্রবাদের অনুসারী পারসিক জাতি এই উৎসবের প্রবর্তক, যদিও সময়ের সঙ্গে নানা পরিবর্তন ঘটেছে। নওরোজে তেহরানসহ প্রধান নগরগুলো ফাঁকা হয়ে যায়, মানুষ গ্রামে শিকড়ের কাছে পৌঁছাতে চেষ্টা করে। নতুন পোশাক, ভোজপর্ব ও পিতৃপুরুষদের সমাধিতে প্রার্থনা এই উৎসবের অংশ। আগুন নিয়ে খেলা নওরোজের জরথুস্ত্রবাদী উৎস স্মরণ করিয়ে দেয়, কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ আনন্দে রূপান্তরিত হয়েছে।
ঔপনিবেশিকতা ও ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম
বাংলা নববর্ষের পথ চলা সহজ ছিল না। ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন বাংলা নববর্ষকে নগর থেকে নির্বাসিত করেছিল, এটি টিকে ছিল গ্রামীণ জীবনে ও মেলায়। পাকিস্তানি জমানায় বাঙালির জাতিসত্তা পিষ্ট হওয়ার সময় বৈশাখ নবপ্রাণ পায়, এবং ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয় জাগরণে এটি নগরজীবনে ফিরে আসে ছায়ানটের বর্ষবরণ সংগীতায়োজনের মাধ্যমে।
অন্যদিকে, ইরানে নওরোজ উৎসব ইসলামি প্রজাতন্ত্রেও ধর্মনিরপেক্ষভাবে পালিত হয়, যেখানে ইহুদি সম্প্রদায়েরও অংশগ্রহণ রয়েছে। ইসরায়েলি বোমা হামলায় তেহরানের ইহুদি সিনাগগ ধ্বংসের ঘটনা ইরানের সভ্যতার সৌন্দর্য ও সমন্বয়বাদী চরিত্র প্রকাশ করে।
মঙ্গল শোভাযাত্রা: ঐতিহ্যের নবায়ন ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ
বাংলাদেশে মঙ্গল শোভাযাত্রা ঐতিহ্যের নবায়নের অনুপম উদাহরণ, কিন্তু ধর্মীয় সংকীর্ণতার শিকার হয়েছে। কিছু গোষ্ঠী ‘মঙ্গল’ শব্দটিকে হিন্দুয়ানি হিসেবে চিহ্নিত করে আনন্দ শোভাযাত্রা নামকরণের চেষ্টা করে, পরে বৈশাখী শোভাযাত্রা নামে পরিবর্তন করা হয়। এই বিভ্রম বাংলায় ক্রমপ্রসারমাণ মোল্লাতন্ত্রের আক্রমণকে নির্দেশ করে, যা জাতির সুকৃতি বিনষ্ট করছে।
সভ্যতার শক্তি ও ভবিষ্যৎ
বাংলা নববর্ষ ও নওরোজ উৎসবের মিল কোনো কাকতালীয় নয়। মধ্যযুগে ফারসি রাজভাষা হওয়া ও বাংলা সাহিত্যে এর প্রভাব, হাফেজের কবিতা বাঙালি মানসে স্থান পাওয়া—এসবই সভ্যতার সম্মিলনের উদাহরণ। আজকের বিশ্বে, যখন ইরান যুদ্ধের মুখোমুখি, তখনও তার সভ্যতার শক্তি প্রকাশ পায়। একইভাবে, বাংলা নববর্ষের টিকে থাকা বাঙালির সংগ্রামী চেতনার প্রতিফলন।
নববর্ষ উৎসবগুলো শুধু আনন্দের নয়, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষার লড়াইয়েরও প্রতীক। বাংলা ও ইরানের উদাহরণ আমাদের শেখায় যে, ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সভ্যতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব।



