১৪৩৩ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখ: বাঙালির আত্মপরিচয় ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার উৎসবে মেতেছে দেশ
ভোরের রাঙা সূর্য আর রমনার বটমূলে ছায়ানটের সেই চিরচেনা সুর—১৪ এপ্রিল ২০২৬, পয়লা বৈশাখ। আজ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের প্রথম দিন। জীর্ণ পুরাতনকে পেছনে ফেলে নতুনের আবাহনে মেতে উঠেছে পুরো বাংলাদেশ। ইটপাথরের যান্ত্রিকতা ছাপিয়ে আজ রাজপথ থেকে শুরু করে গ্রামের মেঠোপথ, সর্বত্রই ধ্বনিত হচ্ছে—‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’।
শিকড়ের টানে উৎসবে ফেরা
পয়লা বৈশাখ কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক। মুঘলসম্রাট আকবরের আমলে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে যে ফসলি সনের প্রবর্তন হয়েছিল, তা আজ পরিণত হয়েছে বাঙালির প্রাণের উৎসবে। আজকের এই দিনে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষ এককাতারে শামিল। নারীদের পরনে লাল-সাদা শাড়ি, কপালে টিপ; আর পুরুষদের গায়ে পাঞ্জাবি—সব মিলিয়ে এক বর্ণিল জনসমুদ্র তৈরি হয়েছে।
ঐতিহ্যের স্বাদ ও গ্রামবাংলার মেলা
বাঙালির পয়লা বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশের সেই চিরায়ত আমেজ। তবে সময়ের বিবর্তনে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা পদের ভর্তা আর মৌসুমি ফল। রাজধানী ছাড়িয়ে গ্রামীণ জনপদে উৎসবের রূপ আরও আদি ও অকৃত্রিম। বটতলায় বসেছে বৈশাখী মেলা। মাটির পুতুল, নাগরদোলা, বাঁশের বাঁশি আর খই-মুড়কির গন্ধে ম-ম করছে চারপাশ। এই মেলাগুলো গ্রামবাংলার সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিফলন হিসেবে কাজ করছে।
ব্যবসায়ীদের জন্য হালখাতার দিন
ব্যবসায়ীদের জন্য এটি হালখাতার দিন। নতুন খাতার পাতায় লাল ফিতায় বাঁধা শুরু হচ্ছে নতুন বছরের হিসাব-নিকাশ। ক্রেতা-বিক্রেতার এই মিষ্টির আদান-প্রদান বাঙালি সংস্কৃতির এক অনন্য সামাজিক সেতুবন্ধন তৈরি করে। এটি শুধু অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়, বরং সম্প্রীতি ও বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়।
কেন এই উৎসব আজও প্রাসঙ্গিক?
বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে যখন সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটছে দ্রুত, তখন পয়লা বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির শক্তি। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের একটি সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে। ২০২৬ সালের এই নতুন সকালে বাঙালির প্রার্থনা একটাই—দেশ থেকে দূর হোক ঘৃণা আর বিভেদ, জয় হোক মানবতা। এই উৎসব আমাদের ঐক্যবদ্ধ করে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]



