রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যর নেতৃত্বে সুরের ধারার শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে পয়লা বৈশাখ উদযাপন
রাতের আঁধার কাটতেই ভোরের প্রথম আলোয় রাজধানীর ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবর প্রাঙ্গণ এক প্রাণময় উৎসবমঞ্চে রূপ নেয়। পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ আয়োজনে হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণে মেতে ওঠেন শিল্পী ও দর্শকরা। সংগীত আর প্রকৃতির মেলবন্ধনে স্বাগত জানানো হয় বঙ্গাব্দ ১৪৩৩-কে, যা বাঙালির সংস্কৃতিতে একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব হিসেবে বিবেচিত।
ভোর থেকে শুরু হওয়া উৎসবের আবহ
মঙ্গলবার ভোর থেকেই রবীন্দ্রসরোবর প্রাঙ্গণে মানুষ আসতে শুরু করে। ধানমন্ডি লেকের পানিতে তখনো সূর্যের আলো পড়েনি, কিন্তু উৎসবের প্রাণবন্ত পরিবেশ ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। বাঙালির কাছে বৈশাখ মানেই গান, মিলন ও নবজাগরণের প্রতীক—পুরোনো বছরের গ্লানি মুছে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার এই আয়োজন যেন এক সম্মিলিত আবেগের প্রকাশ।
নিশীথ দে সেতার পরিবেশনায় অনুষ্ঠানের সূচনা হয়, যা ধীরে ধীরে জমে ওঠে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিল্পীদের অংশগ্রহণে। এটি একটি বৃহৎ সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়, যেখানে সংস্কৃতির চর্চা ও শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
বক্তব্য ও শুভেচ্ছা বার্তা
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে চ্যানেল আইয়ের পরিচালক জহির উদ্দিন মাহমুদ মামুন বলেন, বাঙালির চিরায়ত উৎসবগুলোর মধ্যে পয়লা বৈশাখই সবচেয়ে বড় সর্বজনীন আয়োজন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে সংস্কৃতি চর্চাই মানুষের মনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে পারে।
সুরের ধারার অধ্যক্ষ, খ্যাতিমান রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালামও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন, যা আয়োজনের গুরুত্ব বাড়িয়ে তোলে।
সমবেত ও একক পরিবেশনা
রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যর নেতৃত্বে সুরের ধারার শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে পরিবেশন করেন ‘ওঠো ওঠো রে—বিফলে প্রভাত বহে যায় যে’ গানটি, যা দিয়ে মূল পরিবেশনা শুরু হয়। পরে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা একক কণ্ঠে শোনান ‘নব আনন্দে জাগো আজি নবরবিকিরণে’।
একে একে মঞ্চে আসেন ফাহিম হোসেন চৌধুরী, কিরণচন্দ্র রায়, রফিকুল আলম, স্বাতী সরকার, লুইপাসহ অন্যান্য শিল্পীরা। কিরণ চন্দ্র রায়ের একক পরিবেশনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল।
শিল্পী কোনাল পরিবেশন করেন বাউল শাহ আবদুল করিমের গান ‘কেমনে ভুলিব আমি’, যা দর্শকদের মধ্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। আবৃত্তি পরিবেশন করেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, যা অনুষ্ঠানের বৈচিত্র্য বাড়ায়।
- সমবেত ও একক পরিবেশনায় উঠে আসে ‘বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি’
- ‘ওহে দয়াময়, নিখিল-আশ্রয় এ ধরা-পানে চাও’
- ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা, ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’
- ‘কত যে তুমি মনোহর’
- ‘তুমি নির্মল করো মঙ্গল করে’
- ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’
- ‘আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন’
উৎসবের সমাপ্তি ও প্রতীকী বার্তা
রবীন্দ্রসরোবরে সূর্যের আলো যত উজ্জ্বল হয়েছে, ততই প্রাণবন্ত হয়েছে আয়োজনের আবহ। সুরের ধারাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা একের পর এক পরিবেশনায় মুগ্ধ করেন উপস্থিত দর্শকদের। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানা হয় ‘এসো হে বৈশাখ’ গানের মধ্য দিয়ে—নতুন বছরের আহ্বান জানিয়ে, পুরোনো দিনের গ্লানি মুছে ফেলার প্রতীকী বার্তা নিয়ে।
এই আয়োজন শুধু একটি সংগীতানুষ্ঠানই নয়, বরং বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি অনন্য উদাহরণ। এটি প্রমাণ করে যে সংস্কৃতি চর্চা মানুষের মধ্যে একতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।



