বন্ধুর বৈশাখী দাওয়াত ও তেল সংকটে উৎসব উদযাপনে বাধা
চৈত্রসংক্রান্তির দিন, অর্থাৎ বাংলা বছরের শেষ সন্ধ্যায়, এক প্রবীণ ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ফোন কল এল। বয়স ৮৩ প্লাসের এই বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে সচরাচর দেখা হয় না, তাই মোবাইল যন্ত্রটিই একমাত্র সহায়। পরস্পরের কুশল বিনিময় শেষে প্রায় দশ মিনিট স্বাস্থ্য ও অসুখ-বিসুখ নিয়ে আলোচনা হলো, তারপর আধঘণ্টা স্মৃতিচারণা এবং বিশ মিনিট পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেওয়ার দস্তুর পালন করা হল। কিন্তু এবার বন্ধুটি সেসব বিষয়ে যাননি। একথা-সেকথার পর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, পয়লা বৈশাখে, অর্থাৎ আগামীকাল কী করা হবে, রমনা বটমূলে ছায়ানটের সংগীতানুষ্ঠানে যাওয়া হবে কি না, নাকি চারুকলার শোভাযাত্রায় শামিল হওয়া হবে—এই সব প্রশ্নের অবতারণা করলেন।
উৎসব থেকে দূরে থাকার কারণ
প্রবীণ ব্যক্তি ওসবের কোনোটাতেই যেতে পারবেন না বলায় বন্ধুটি বেশ খুশি হলেন। তিনি বললেন, ‘তাইলে বাসায় আসো। পয়লা বৈশাখের দাওয়াত নাও। বেশি কিছু না, ডাল–ভাত আর কয়েক রকমের ভর্তা-ভাজি, এইটুকুই থাকবে।’ সবটা শুনে প্রবীণ ব্যক্তি লোভ সংবরণ করে বললেন, ‘যেতে পারলে খুশি হতাম। কিন্তু উপায় নেই। শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। সেটাও ভুলে থাকা যেত কিন্তু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের যুদ্ধ-খপ্পরে পড়ায় কোনো কিছুই করার জো নাই।’ বন্ধু বললেন, ‘তোমারে যুদ্ধে পাইল কেমনে? পরিবারের কেউ কি ওই সব দিকে বসবাস করতাছে? তেমন হইলে তো দুশ্চিন্তার বিষয়।’
বন্ধুর ভাবনাচিন্তা সুদূর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে ধাবিত হতে দেখে প্রবীণ ব্যক্তি বিস্মিত হলেন না। ইদানীং সবার মুখে মুখে একই কথা চলে। তাঁর মুখেও সেসব শুনে তাই ধরেই নিলেন যে যুদ্ধের ব্যাপারটা তাঁকেও ভাবিয়ে তুলেছে। এবার প্রবীণ ব্যক্তি আসল কথাটা বললেন। ‘আসলে যুদ্ধে আমাকেও পেয়েছে। পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানাদি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে বাধ্য হয়েছি।’ এ কথার পর যোগ করলেন যে কোথাকার যুদ্ধ কোথায় এসে ঠেকেছে। আমাদের অতি প্রিয় পয়লা বৈশাখের ওপরও এর খাঁড়া এসে ভর করেছে।
তেল সংকটের প্রভাব
সেটা কেমন, তার কারণটি এবার খুলে বললেন, ‘মনে কিছু কইরো না। সুযোগ থাকলে অবশ্যই যেতাম। কতকাল পরে তোমার একটা দাওয়াত পাইলাম, আগামী বছর থাকি কি না থাকি কে জানে, তোমার দাওয়াতটা এ বছর মিস করলাম। আসলে আমার গাড়ির তেল নাই। তাই চলাফেরা বন্ধ তেলের আকালে পড়ে। তা ছাড়া তেলের পাম্পে গাড়ির যে লাইন, তা দেখে আতঙ্কিত হওয়ার দশা।’ বন্ধু যুদ্ধে লিপ্ত দেশগুলোকে গালাগাল না দিয়ে নিজ দেশের স্বার্থান্বেষী লোকদের সম্পর্কে বললেন, ‘এসব অসাধু মানুষের কারসাজি। এরা সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।’
প্রবীণ ব্যক্তি বন্ধুর কথার পিঠে কথা না বসিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, ‘ওসব কথা থাক। বৈশাখ নিয়ে বরং কথা বলি। এবার বৈশাখ উদযাপনে আমার মনে হয় পান্তা-ইলিশ খাওয়া কমবে। কারণ, বাজারে ইলিশ পাওয়ার কথা না, ধরার নিষেধাজ্ঞার জন্যে।’ বন্ধু বললেন, ‘সেই ক্ষেত্রে চাপিলা দিয়া খাওন লাগবো আরকি। দুধের স্বাদ ঘোলে মিটাইতে হইবো। আর যাতায়াতে “টেসলা” গাড়ি তো আছেই।’ প্রবীণ ব্যক্তি বললেন, ‘টেসলা! সে তো অনেক দামি ব্যাপার। তেলহীন অবস্থায় ওসব এ দেশে চালাবে কে? ওসব আছে নাকি ঢাকায়?’
শহুরে উৎসবের রূপ
বন্ধু ব্যাপারটা খোলাসা করে বললেন, ‘আরে না। ঢাকায় চার্জার দিয়ে চলা রিকশাগুলোকে সবাই ঠাট্টা করে টেসলা নাম দিয়েছে, শোনোনি?’ আবার প্রসঙ্গ পাল্টালেন চৈত্র-বৈশাখের দিকে টেনে এনে। ‘সেসব কথা থাক। উৎসবগুলো নিয়ে বরং কথা হোক। আমার কিন্তু চৈত্রসংক্রান্তিই ভালো লাগে। দোকানে দোকানে মিষ্টি খাওয়াখাওয়ির ধুম পড়ে হালখাতার কারণে। বছর শেষের মন খারাপ অবস্থাটি ভুলে থাকতে এই সব খাওয়াদাওয়ার উৎসব চলে বলে আমার ধারণা। আমার মনে আছে, এই দিনটিতে একসময় গ্রামে-গঞ্জে মেলার আয়োজন হতো। সেটিকে জুড়ে দিত পয়লা বৈশাখের সঙ্গে। তারপরও কয়েক দিন ধরে চলত। যত দূর মনে পড়ে, গেন্ডারিয়া-সূত্রাপুর এলাকার লোহারপুলে মেলা বসত লোকশিল্পের পসরা নিয়ে। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলো থেকে দোকানিরা আসত হরেক গ্রামীণ জিনিস নিয়ে। মুড়ি-মুড়কি, কদমা-বাতাসাসহ মিষ্টির দোকান বসত। সেসব এখন আর নেই।’
বন্ধু বললেন, ‘অহন পয়লা বৈশাখ পালনটা শহুরে উৎসব হইয়া গেছে। সারা বছর শহরের সবাই সায়েব-সুবা সাইজা থাকে, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি-মার্চ ইত্যাদির গুনতিটা প্র্যাকটিস করে, পয়লা বৈশাখ আসলে এক দিনের বাঙালি সাজে খাওয়াদাওয়ায়, পোশাক-আশাকে।’ কথা প্রায় শেষ পর্যায়ে দুজনেরই। তাই লাইন কাটার বোতামে আঙুল ছোঁয়ানোর আগে বৈশাখী শুভেচ্ছা জানালেন প্রবীণ ব্যক্তি। সেই সঙ্গে সারা বছর জীবনটা সুখ-শান্তিতে ভরে উঠুক, এসব নিয়ে তাঁর সর্বময় মঙ্গল কামনা করলেন। বন্ধু সে কথা শুনে হেসে বললেন, ‘বৈশাখী ব্যাপারস্যাপারে মঙ্গল শব্দটা উচ্চারণ কইরো না। ওইটাতে অনেকের অ্যালার্জি। এমনিতে মঙ্গলবার, মঙ্গল গ্রহ, এককালের দুর্বিনীত মোঙ্গল জাতি ইত্যাদি কইতে আপত্তি নাই। সেসব উচ্চারণে অভ্যস্ত সবাই। শুধু বৈশাখের পয়লা দিনে ওইটা ব্যবহারে গাঁইগুঁই। তবে এইবার মজা হইলো যে পয়লা বৈশাখের দিনটি পড়ছে মঙ্গলবারেই!’



