ঢাকায় বৈশাখী শোভাযাত্রার মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ বরণের সূচনা
বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে ঢাকা শহরে শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। মঙ্গলবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে এই শোভাযাত্রার সূচনা হয়। রাষ্ট্রীয় অতিথি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষক এবং সর্বস্তরের মানুষ এতে অংশ নিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করেছেন।
বহু বছর ধরে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক
বাংলা নববর্ষ উদযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে এই শোভাযাত্রা। বহু বছর ধরে এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে টিকে আছে। ২০১৬ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, যা এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করে।
বাংলা নববর্ষের এই শোভাযাত্রাটি সময়ের সাথে বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়েছে। যশোরে এটি ‘বর্ষবরণ শোভাযাত্রা’, ঢাকায় ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত ছিল। তিন দশকেরও বেশি সময় এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে উদযাপিত হয়েছে এবং বর্তমানে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিত। নাম পরিবর্তন হলেও এর উৎসবমুখরতা ও জনপ্রিয়তা কখনোই কমেনি।
এ বছরের প্রতিপাদ্য ও মোটিফের তাৎপর্য
এ বছরের শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নববর্ষের সুরে ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ’। শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত মোটিফগুলোর প্রতিটির রয়েছে গভীর অর্থ ও প্রতীকী তাৎপর্য।
- মোরগ: গণতান্ত্রিক ভোরের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
- হাতি: সোনারগাঁওয়ের ঐতিহ্যবাহী মোটিফের স্মারক হিসেবে উপস্থাপিত।
- পায়রা: শান্তির প্রতীক হিসেবে শোভাযাত্রায় স্থান পেয়েছে।
- টেপা পুতুল-ঘোড়া: গ্রামীণ ঐতিহ্য ও লোকশিল্পকে নির্দেশ করে।
- দোতারা: বাউল সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এবং তাদের ওপর হামলার প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
পটচিত্রে বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির চিত্রায়ন
এবারের শোভাযাত্রায় পাঁচটি মোটিফের পাশাপাশি পাঁচটি পটচিত্রও প্রদর্শিত হচ্ছে। এসব পটচিত্রের কাজ করেছেন প্রখ্যাত পটচিত্রী টাইগার নাজির। পটচিত্রগুলোতে বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
- দেবী বনবিবি: সুন্দরবনে জীবিকা নির্বাহকারীদের প্রতিনিধিত্বকারী চরিত্র।
- মুঘল সম্রাট আকবর: বাংলা নববর্ষের প্রবর্তক হিসেবে চিত্রিত।
- বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন: জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
- গাজীর পট: লোকচিত্রকলার ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন।
- বেহুলা: মঙ্গলকাব্য মনসামঙ্গলের বিখ্যাত চরিত্র।
শোভাযাত্রার বর্ণাঢ্য কাঠামো ও অংশগ্রহণকারীগণ
চলতি বছরের শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে পুলিশের অশ্বারোহী দলের মাধ্যমে। এরপর জাতীয় পতাকা বহনকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছেন। সাংবাদিকদের মিছিলের পর প্রধান ব্যানার নিয়ে এগিয়ে গেছেন রাষ্ট্রীয় অতিথি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বিভিন্ন অনুষদের ডিন এবং আবাসিক হলগুলোর প্রভোস্টদের পর অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন বিভাগের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মচারীরা। জাসাস (জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা) এবং জাতীয় কবিতা পরিষদ একসঙ্গে মিছিল করেছে।
শোভাযাত্রার শেষ অংশে উপস্থিত হয়েছে পাঁচটি বড় মোটিফ, ঢাকের দল এবং ১৫০ ফুট দীর্ঘ স্ক্রল পেইন্টিং। সবার শেষে অংশ নিয়েছেন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী এবং ১১৫টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা, যা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
এই শোভাযাত্রা কেবল একটি উৎসব নয়, বরং বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং জাতীয় সংহতির জীবন্ত প্রদর্শনী। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি এই ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।



