লাখো ভক্তের পদচারণায় মুখরিত লাঙ্গলবন্দ, মহাষ্টমী পুণ্যস্নানে উৎসবমুখর পরিবেশ
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার ঐতিহাসিক তীর্থস্থান লাঙ্গলবন্দে বুধবার বিকাল থেকে শুরু হয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ঐতিহ্যবাহী দুই দিনব্যাপী মহাষ্টমী পুণ্যস্নান। উৎসবমুখর পরিবেশে হাজার হাজার পুণ্যার্থী ব্রহ্মপুত্র নদে অবগাহন করছেন, পাপ মোচনের আশায়।
পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণ ও তর্পণ অনুষ্ঠান
‘হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য আমার পাপ হরণ কর’— এই পবিত্র মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে ভক্তরা আদি ব্রহ্মপুত্র নদে স্নান করছেন। বুধবার বিকাল ৫টা ১৭ মিনিটে স্নানের লগ্ন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নদে পুণ্যার্থীদের ঢল নামে। সনাতন ধর্মের রীতি অনুযায়ী, ফুল, বেলপাতা, ধান, দুর্বা, হরিতকি ও ডাব দিয়ে পিতৃকুলের উদ্দেশ্যে তর্পণ করছেন ভক্তরা। এই পুণ্যলগ্ন চলবে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত।
২৪টি স্নানঘাটে ভিড়, আন্তর্জাতিক ভক্তের আগমন
লাঙ্গলবন্দের ২৪টি স্নানঘাটেই এখন তিলধারণের ঠাঁই নেই। বিশেষ করে রাজঘাট ও গান্ধীঘাটে পুণ্যার্থীদের সমাগম চোখে পড়ার মতো। দেশি পুণ্যার্থীদের পাশাপাশি এবার ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকেও প্রচুর ভক্তের আগমন ঘটেছে, যাদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা তীর্থস্থান। ঢাকার বাংলাবাজার থেকে আসা পুণ্যার্থী মিনা রাণী জানান, ‘ব্রহ্মপুত্রের পবিত্র জলে স্নান করলে ব্রহ্মার কৃপা লাভ ও সব পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়— এই বিশ্বাস থেকেই আমরা দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে এসেছি।’
সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা বেষ্টনী
বিগত সময়ে রাজঘাটের কাছে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনায় প্রাণহানির স্মৃতি এখনো অনেকের মনে থাকলেও, এবারের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় ভক্তদের মাঝে কোনো আতঙ্ক দেখা যায়নি। জেলা প্রশাসক রায়হান কবির জানান, পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে পানীয় জল, চিকিৎসাসেবা এবং থাকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন, স্নানোৎসব ঘিরে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সিসিটিভি ক্যামেরা ও সাদা পোশাকে পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি নদীতে নৌপুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও চিকিৎসা সেবা
উৎসবকে কেন্দ্র করে অর্ধশতাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভক্তদের মাঝে খাবার বিতরণসহ নানা সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্নানার্থীদের জরুরি চিকিৎসায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একাধিক মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারি ও স্থানীয় প্রশাসনের সঠিক ব্যবস্থাপনায় এবারের স্নানোৎসব অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হচ্ছে।
এই মহাষ্টমী পুণ্যস্নান শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং এটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। লাখো ভক্তের অংশগ্রহণে লাঙ্গলবন্দের পরিবেশ পবিত্রতা ও উৎসবের মিশেলে সজীব হয়ে উঠেছে।



