অমর একুশে বইমেলায় গতকালের স্বল্প জনসমাগম ও ফাঁকা পরিবেশ
ছুটির দিনে সকাল থেকেই অমর একুশে বইমেলার কথা ভাবলে সাধারণত উৎসবমুখর পরিবেশ আর উপচে পড়া ভিড়ের চেনা ছবি মনে পড়ে। কিন্তু গতকালের পরিবেশ ছিল তার চেয়ে একেবারে আলাদা ও মনমরা। দুই সারি স্টলের মধ্যে ফাঁকা পথ দেখা গেছে, আর মেলার মাঠের পরিবেশও স্বচ্ছন্দে চলাচলের মতো ছিল না। স্টল নির্মাণ ও মাঠে চলাচলের সুবিধার জন্য ইট বিছানোর কাজ চলেছে গতকালও, যা দর্শনার্থীদের জন্য কিছুটা অসুবিধা তৈরি করেছে।
অল্পসংখ্যক দর্শনার্থী ও বই কেনার কম আগ্রহ
অল্পসংখ্যক যে লোক এসেছিলেন, তাঁদেরও বই কেনার প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না বলে প্রতীয়মান হয়েছে। ইফতারের পরে আলোঘর প্রকাশনীর স্টলের সামনে শিশুদের বই পছন্দ করছিলেন মোনালিসা আক্তার। তাঁর সঙ্গে ছিল দুই ভাগনি—দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তানহা আক্তার ও অষ্টম শ্রেণির জান্নাতুল ফেরদৌস। তাঁরা এসেছিলেন মোহাম্মদপুর থেকে। মোনালিসা বলেন, টিএসসিতে ইফতার করে মেলায় ঢুকেছেন। তাঁর কাছে মনেই হচ্ছে না ছুটির দিনের বইমেলা। তাঁর ভাষায় ‘ফাঁকা ফাঁকা মনমরা পরিবেশ’।
বেচাকেনা কেমন, জানতে চাইলে আলোঘর স্টলের ব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘শুনলেন তো উনি কী বললেন। লোকই আসে না, বেচাকেনা হবে কেমন করে। যা বিক্রি হয়েছে, তা বলার মতো নয়।’ এই মন্তব্য থেকে প্রকাশকদের হতাশার ছাপ স্পষ্ট।
শিশুপ্রহরের সূচনা ও নতুন বইয়ের আগমন
গতকাল শুক্রবার ছিল মেলার প্রথম শিশুপ্রহর। বেলা ১১টা থেকে মেলা শুরু হয়েছিল শিশুদের জন্য। এবার শিশুতোষ বইয়ের স্টলগুলো রাখা হয়েছে উন্মুক্ত মঞ্চের পূর্ব পাশে। রমজান মাসে ইফতারের পরে মেলায় লোকসমাগম তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেড়েছিল, কিন্তু তা আশানুরূপ নয়।
প্রথমা প্রকাশনের স্টলে বেশ কিছু নতুন বই এসেছে দ্বিতীয় দিনে। এর মধ্যে আছে কবি জীবনানন্দ দাশের স্ত্রী লাবণ্য দাশের জীবন অবলম্বনে মাসউদ আহমাদের উপন্যাস লাবণ্যর মুখ, মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিকের গবেষণাগ্রন্থ শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা। বিক্রয় প্রতিনিধিরা জানালেন, গতকাল প্রথমায় বেশি বিক্রি হয়েছে ইসমাইল আরমানের কিশোর অ্যাডভেঞ্চার ‘অয়ন-জিমি’ সিরিজের বই। এ ছাড়া মহিউদ্দিন আহমদের আহমদ ছফাকে নিয়ে লেখা আমার কথা কইবে পাখি বইটিরও চাহিদা ছিল।
তথ্যকেন্দ্র চালু ও ভবিষ্যতের আশা
এদিকে গতকাল থেকে মেলার তথ্যকেন্দ্র চালু হয়েছে। এখানে ১৮টি নতুন বইয়ের নাম জমা পড়েছে। আজ শনিবারও শিশুপ্রহর থাকবে। শুরু হবে বেলা ১১টায়। আজ লোকসমাগম বাড়ার আশা করে আছেন প্রকাশকেরা। তাঁরা মনে করছেন, সপ্তাহের শেষ দিনে বেশি দর্শনার্থী আসতে পারে, যা বই বিক্রি বাড়াতে সহায়ক হবে।
শিলালিপি বইয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ইতিহাসের অনেক তথ্যের উৎস হলো প্রত্নলিপি। পুরোনোকালের নানা তথ্য ও ঘটনা উৎকীর্ণ রয়েছে সে যুগের প্রত্ন বা শিলালিপিগুলোতে। ভবিষ্যতের মানুষের কথা ভেবেই সমকালীন ঘটনার বিবরণ, তথ্য ও বাণী-বিবৃতি লিখে রাখা হতো কঠিন পাথরের গায়ে। সে যুগের মানুষের জীবনযাত্রা, চিন্তাচেতনা, ধর্ম ও সংস্কৃতির পরিচয় লাভের পক্ষে এগুলোর উপকরণগত মূল্য অপরিসীম।
শিলালিপিতে আরবি-ফারসি ভাষার ব্যবহার পৃথিবীর প্রথম যে অঞ্চলগুলোতে দেখা যায়, বাংলাদেশ তার অন্যতম। বাংলার স্থাপত্য অলংকরণেও এসব শিলালিপির রয়েছে বিশিষ্ট স্থান। শিলালিপি: বাংলার আরবি-ফারসি প্রত্নলেখমালা নামের প্রথমা প্রকাশনের এ বইটিতে লেখক বাংলা অঞ্চলে প্রাপ্ত আরবি ও ফারসি ভাষায় লেখা শিলালিপির পাঠোদ্ধার ও পরিচয় তুলে ধরার পাশাপাশি সেগুলোর ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করেছেন।
লেখক মুহম্মদ ইউসুফ সিদ্দিক বঙ্গীয় শিল্পকলাচর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের অতিথি অধ্যাপক। আগে তিনি শারজাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, জায়েদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ও ইসলামি অধ্যয়ন বিভাগের প্রতিষ্ঠাতাপ্রধান ছিলেন। এই বইটি ইতিহাসপ্রেমী পাঠকদের জন্য একটি মূল্যবান সংযোজন হতে পারে।
