খুলনা ফুড ব্যাংকের ইফতার আয়োজনে পথচারীদের মুখে হাসি
প্রতিবছরের মতো এবারও খুলনা ফুড ব্যাংক রমজান মাসে পথচারীদের জন্য বিশেষ ইফতারের আয়োজন করেছে। খুলনা নগরের ব্যস্ততম শিববাড়ী মোড়ে মঙ্গলবার প্রায় ১২০ জনের জন্য এই ইফতার অনুষ্ঠিত হয়, যা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ব্যস্ত শহরে মানবিকতার ছোঁয়া
খুলনা নগরের অন্যতম কেন্দ্রস্থল শিববাড়ী মোড়ে শহরের ব্যস্ততা তখনো থামেনি। ইজিবাইকের হর্ন, রিকশার ঘণ্টার শব্দ এবং মানুষের ছুটে চলা—সব মিলিয়ে এক অব্যাহত কোলাহল বিরাজ করছিল। মেঘলা আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে গোধূলির দিকে ঝুঁকছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ফুটপাতে বিছানো সবুজ ত্রিপলের ওপর সাজানো হয়েছিল সারি সারি প্লেট।
কলা, খেজুর, জিলাপি, ছোলা, পেয়ারা, গাজর, আলুর চপ, বেগুনি এবং পেঁয়াজুর মতো নানা রকম ইফতারি সামগ্রী যেন ক্লান্ত চোখকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল। পাশে সাজানো ছিল শরবত ও পানির বোতল, যা দ্রুত ভিড় জমাতে শুরু করে রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ইজিবাইকচালক ও সাধারণ পথচারীদের।
স্বেচ্ছাসেবকদের নিরলস প্রচেষ্টা
খুলনা ফুড ব্যাংক ও খুলনা ব্লাড ব্যাংকের স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রতিদিন নগরের বিভিন্ন এলাকায় বিনা মূল্যে এই ইফতারের আয়োজন করছেন। রমজানে জীবিকার তাগিদে যাঁদের ইফতারের সময়ও রাস্তায় থাকতে হয়, মূলত তাঁদের জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংগঠনের অর্থ সম্পাদক মো. আসাদ শেখ বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো রাস্তায় থাকা রোজাদারদের সম্মানজনকভাবে ইফতার নিশ্চিত করা। দিনমজুর, চালক ও পথচারী—যাঁদের ইফতারের সময়ও কাজ করতে হয়, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই মূল উদ্দেশ্য।’
তিনি আরও জানান, এ বছর শিববাড়ী মোড় ছাড়াও পাবলিক কলেজ মোড়ে এই আয়োজন করা হয়েছে এবং দৌলতপুর নতুন রাস্তা, রয়েল মোড় ও রেলওয়ে স্টেশনেও ইফতারের কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ রোজাদারের জন্য ইফতার প্রস্তুত করা হয়, যাতে খরচ হয় সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকা।
ইফতারিসামগ্রী বিতরণের ব্যাপক উদ্যোগ
ইফতার বিতরণের পাশাপাশি সংগঠনের উদ্যোগে ইফতারিসামগ্রীর বস্তাও দেওয়া হচ্ছে। এ বছর ইতিমধ্যে প্রায় ৬০০ জনকে এই বস্তা দেওয়া হয়েছে এবং লক্ষ্য রয়েছে ২ হাজার জনকে পৌঁছানোর। প্রতিটি বস্তায় থাকে এক কেজি তেল, এক কেজি লবণ, দুই কেজি পেঁয়াজ, পাঁচ কেজি আলু এবং এক কেজি করে ছোলা, মুড়ি ও চিনি।
দরিদ্র রোজাদারদের ঠিকানা সংগ্রহ করে গোপনে তাঁদের বাড়িতে ইফতারিসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়। মসজিদের ইমাম ও মোয়াজ্জিনদের জন্যও সামগ্রী দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। খুলনা ফুড ব্যাংক, ব্লাড ব্যাংক ও অক্সিজেন ব্যাংকের সভাপতি সালেহ্ উদ্দিন (সবুজ) বলেন, ‘হতদরিদ্র মানুষের অধিকার নিয়ে আমরা কাজ করি। রমজানজুড়ে নানা কার্যক্রমের মধ্যে প্রতিদিন রাস্তায় থাকা মানুষের জন্য ইফতার অন্যতম।’
সম্প্রসারিত পরিধি ও অংশগ্রহণকারীদের প্রতিক্রিয়া
সালেহ্ উদ্দিন আরও উল্লেখ করেন যে করোনার সময় থেকে প্রতিবছর এই কার্যক্রম চালু রয়েছে। শুরুর দিকে ২০-৩০-৫০ জনের জন্য আয়োজন করা হলেও এবার পরিধি আরও বাড়ছে। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জনকে ইফতার দেওয়া হচ্ছে এবং এবারই একদিন ৫০০ জনকে ইফতার দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।
শিববাড়ীতে ইফতার করতে আসা নির্মাণশ্রমিক মোহাম্মদ বিল্লাল বলেন, ‘সারা দিন কাজে থাকি। অনেক সময় বাসায় গিয়ে ইফতার করা সম্ভব হয় না। এখানে ইফতার পেয়ে খুব উপকার হয়।’ একজন ভ্যানচালকও যোগ করেন, ‘এখানে ইফতারের ব্যবস্থা থাকায় অন্তত ইফতারের চিন্তা করতে হয় না। আল্লাহ যেন তাঁদের ভালো রাখেন।’
ইফতার শেষে সবাই ধীরে ধীরে তাঁদের গন্তব্যে রওনা হন। কেউ মসজিদে নামাজে যান, কেউ আবার দ্রুত কাজে ফিরে যান। ফুটপাতের ওই ছোট্ট ত্রিপল এবং সারি সারি প্লেট তখনো পড়ে থাকে মানবিকতার এক নীরব নিদর্শন হিসেবে, যা খুলনা শহরে রমজানের বিশেষ আবহ তৈরি করেছে।
