ইলিশের দাম: প্রতি বছর একই চক্র, সমাধান কোথায়?
ইলিশের দামের চক্র: কেন প্রতি বছর একই অবস্থা?

পহেলা বৈশাখ চলে গেছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা শেষ, রমনার বটমূলের গান থেমেছে, পান্তার থালাও সরে গেছে। কিন্তু এই উৎসবের পেছনে যে অর্থনৈতিক প্রশ্নটা প্রতি বছর মাথা তুলে দাঁড়ায়, সেটা এখনও জবাব পায়নি—বছরের পর বছর কেন ইলিশের দাম একই কায়দায় বাড়ে, একই মানুষ কিনতে পারেন না, আর একই কথাগুলো বলা হয়?

এ বছরও ব্যতিক্রম হয়নি। বৈশাখের আগের সপ্তাহে রাজধানীর বড় বাজারগুলোতে পদ্মার ভালো ইলিশের কেজি উঠেছিল তিন হাজার আটশত থেকে চার হাজার টাকায়। আগের সপ্তাহে ছিল তিন হাজার দুইশত থেকে তিন হাজার পাঁচশত। সাত দিনের ব্যবধানে পাঁচশত থেকে সাতশত টাকা। মাঝারি আকারের আটশত-নয়শত গ্রামের ইলিশও তিন হাজার টাকার নিচে মিলছিল না। উৎসব পেরিয়ে গেছে। দাম কিছুটা নামবে। কিন্তু এই চক্রটা কেন তৈরি হয়, আর এর থেকে বের হওয়ার পথ কোথায়— সেই প্রশ্নের উত্তর না দিলে আগামী বৈশাখেও এই একই লেখা লিখতে হবে।

ইলিশ শুধু মাছ নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনীতি

ইলিশকে যারা শুধু উৎসবের মাছ ভাবেন, তারা ছবির একটি কোনা দেখছেন। পুরো ছবিটা অনেক বড়। বাংলাদেশের মোট জিডিপিতে ইলিশের অবদান ১ শতাংশ। মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে, যার চলতি বাজারমূল্য প্রায় একুশ হাজার কোটি টাকা। ছয় লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ ধরার কাজে যুক্ত। পরিবহন, বিক্রয়, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রফতানিতে জড়িত আরও বিশ থেকে পঁচিশ লাখ মানুষ। প্রতিবছর ইলিশ রফতানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসে প্রায় তিনশত কোটি টাকা। এই তথ্যগুলো একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, ইলিশের দাম কমানো বা বাড়ানো শুধু ভোক্তার সুবিধার প্রশ্ন নয়—এটা কোটি মানুষের জীবিকার প্রশ্ন। তাই এই খাতের বাজার কাঠামো ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা জরুরি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

উৎপাদন বাড়লো, তবু দাম কমলো না

একটা যুক্তি প্রায়ই শোনা যায়—নদীতে মাছ কম, তাই দাম বেশি। পরিসংখ্যান দেখলে এই যুক্তি পুরোপুরি টেকে না। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল দুই লাখ নব্বই হাজার টন। মাত্র নয় বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে পাঁচ লাখ সতের হাজার টনে পৌঁছায়, বৃদ্ধির হার প্রায় ৬৬ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল পাঁচ লাখ ঊনত্রিশ হাজার টন। কিন্তু একটা উদ্বেগজনক প্রবণতাও চোখে পড়ছে। গত আট বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম উৎপাদন হয়েছে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে, মাত্র পাঁচ লাখ টন। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত সময়ে ইলিশ আহরণ কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। তার মানে দুটো জিনিস একসঙ্গে ঘটছে। একদিকে উৎপাদন কমছে, অপরদিকে বৈশাখ এলে বাজারে সরবরাহ আরও কৌশলে কমিয়ে রাখা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই সরবরাহ কমা কতটা প্রাকৃতিক, আর কতটা কৌশলগত?

সরবরাহ শৃঙ্খলে কার হাত কোথায়

মাছ ধরা থেকে ক্রেতার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত ইলিশকে পার হতে হয় বেশ কয়েকটি স্তর। জেলে থেকে আড়তদার, আড়তদার থেকে পাইকার, পাইকার থেকে খুচরা বিক্রেতা। প্রতিটি স্তরে মার্জিন যোগ হয়। বৈশাখের আগে এই মার্জিন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটা বেড়ে যায়। উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে প্রতিদিন কয়েক মণ ইলিশ সড়কপথে ঢাকায় আসে, কারণ ঢাকায় দাম বেশি। এই প্রক্রিয়ায় উৎপাদনস্থলে সরবরাহ কমে, আবার রাজধানীতেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকে। ফলে দুই জায়গায়ই দাম বাড়ে। এটা এক বিচিত্র পরিস্থিতি। ইলিশের জেলায় বাস করেও মানুষ ইলিশ কিনতে পারছেন না।

জাটকা বাঁচলে ইলিশ বাঁচে, কিন্তু প্রলোভন সামলানো যাচ্ছে না

বৈশাখ এলে আরেকটি সমস্যা প্রতি বছর মাথাচাড়া দেয়। নদীতে জাটকার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত। মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত জাটকা ধরা আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু বৈশাখের আগে বেশি দামের প্রলোভনে অনেক জেলে সেই নিষেধাজ্ঞা ভাঙেন। এই জাটকাই আগামী বছর এক কেজির পরিপক্ব ইলিশ হতে পারতো। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের নিষেধাজ্ঞায় ৫২.৫ শতাংশ মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়ে এবং ৪৪.২৫ হাজার কোটি জাটকা উৎপন্ন হয়। তবে ২০২৫ সালে নিষেধাজ্ঞা শেষে প্রত্যাশিত উৎপাদন বৃদ্ধি হয়নি, জুলাই-আগস্টে আহরণ আগের বছরের তুলনায় ৩৩.২০ শতাংশ ও ৪৭.৩১ শতাংশ কমে। এই সংখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। নিষেধাজ্ঞা মানা হলে প্রজনন ভালো হয়। কিন্তু পরের মৌসুমে উৎপাদন বাড়ছে না। কারণ, নিষেধাজ্ঞার বাইরের সময়ে অতিরিক্ত আহরণ হচ্ছে। একসময় দেশে প্রায় বিশ লাখ টন ইলিশ উৎপাদিত হতো, তা কমে প্রায় দুই লাখ টনে নেমে আসে। বর্তমানে জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রমের ফলে উৎপাদন পুনরায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাটকা নিধন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা গেলে দেশে ইলিশের উৎপাদন পুনরায় বিশ লাখ টনে নেওয়া সম্ভব। এই সম্ভাবনা পূরণ না হলে ইলিশের দাম দীর্ঘমেয়াদে কমার কোনও কারণ নেই।

দাম বাড়াটা কি শুধু চাহিদার স্বাভাবিক খেলা

অর্থনীতির সরল সূত্র বলে, চাহিদা বাড়লে এবং সরবরাহ না বাড়লে দাম বাড়বে। পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশের চাহিদা বাড়ে, এটা সত্য। কিন্তু প্রতি বছর সাত দিনের ব্যবধানে পাঁচশত-সাতশত টাকা বাড়া কি শুধু চাহিদার ফল? এই প্রশ্নের সৎ জবাব হলো, সম্ভবত না। ক্রেতারা নিজেরাই বলছেন, বাজারে সিন্ডিকেট কাজ করছে। বিক্রেতারা বলছেন, আড়ত থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এই চক্রে খুচরা বিক্রেতাও কম দামে বেচতে পারেন না। সমস্যাটা তাই আড়ত স্তরে। সেখানে দামের নিয়ন্ত্রণ যদি গুটিকয়েক ব্যবসায়ীর হাতে থাকে, বৈশাখের আগে দাম বাড়ানো কঠিন নয়।

মধ্যবিত্তের হিসাব মেলে না

এ বছর রাজধানীর বাজারে দেখা গেছে, বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত মানুষ ইলিশের দাম শুনে শেষমেশ খালি হাতেই ফিরে গেছেন। ভালো আয় করার পরও সাধারণ একটি ইলিশ কেনার সাহস সঞ্চয় করতে না পারাটা এখন অনেকের জন্যই রূঢ় বাস্তব। মধ্যবিত্তের যদি এই হাল হয়, তবে নিম্ন আয়ের মানুষের কথা আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না। এখানেই অর্থনীতির এক বড় বৈপরীত্য। পরিকল্পিত সংরক্ষণ আর সঠিক সরবরাহ থাকলে ইলিশের দাম সাধারণের নাগালে আসত, মানুষ বেশি কিনতে পারতো এবং তাতে বাজারের আকারই আরও বড় হতো। গবেষণা বলছে, এই প্রক্রিয়ায় অন্তত সাত হাজার কোটি টাকার বাজার তৈরি হওয়া সম্ভব। কিন্তু মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের তাৎক্ষণিক অতি-মুনাফা লোটার প্রবণতা আমাদের এই বিশাল দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে বারবার নষ্ট করে দিচ্ছে।

কাগুজে তদারকি, বাস্তবে ফাঁকা মাঠ

বৈশাখে বাজার তদারকির কথা প্রতি বছরই বলা হয়। প্রতি বছরই তা কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে। অথচ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া একেবারে অসম্ভব নয়। বৈশাখের আগের দুই সপ্তাহ ইলিশের আড়তে মূল্য পর্যবেক্ষণ বাধ্যতামূলক করা যায়। আড়তদার থেকে খুচরা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ক্রয় ও বিক্রয়মূল্যের তথ্য প্রকাশ্যে রাখার বিধান চালু করলে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা কঠিন হবে। পাশাপাশি নদী দখল, দূষণ, বালি উত্তোলন, নাব্য সংকট ও অবৈধ জালের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে উৎপাদন হ্রাসের প্রবণতা থামানো যাবে না।

পাঁচটি কাজ এখনই শুরু করা দরকার

প্রথমত, ইলিশের সরবরাহ শৃঙ্খলে ডিজিটাল মনিটরিং চালু করতে হবে। প্রতিটি স্তরে কত কেজি মাছ কত টাকায় হাত বদল হচ্ছে, তা রিয়েল টাইমে সরকারি পোর্টালে থাকলে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধির জায়গাটা চিহ্নিত করা সহজ হবে। দ্বিতীয়ত, ১ থেকে ১৫ বৈশাখ পর্যন্ত আকারভেদে ইলিশের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য বেঁধে দিলে এই দুই সপ্তাহের অস্বাভাবিক মুনাফার সুযোগ কমবে। তৃতীয়ত, নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা আরও বড় করতে হবে। জেলে যদি না খেয়ে থাকেন, নিষেধাজ্ঞা মানার প্রশ্নটা তখন আর নৈতিক থাকে না, সেটা বেঁচে থাকার প্রশ্ন হয়ে যায়। চতুর্থত, ইলিশের বার্ষিক উৎপাদনের তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে হবে। তথ্যের স্বচ্ছতা বাড়লে বাজারে কৃত্রিম সংকটের গল্প তৈরি করা কঠিন হয়। পঞ্চমত, নদীর স্বাস্থ্যকে ইলিশ উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে দেখতে হবে। ইলিশ চাষ করা যায় না। তাই নদীর স্বাস্থ্যই ইলিশের ভবিষ্যৎ।

সংস্কৃতির আড়ালে বাজারের খেলা

পান্তা-ইলিশ একটি সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হিসেবে গড়ে উঠেছে অনেক পরে, মূলত আশির দশকের পর থেকে শহরে। কিন্তু এই চাহিদাকে কেন্দ্র করে যে বাজার তৈরি হয়েছে, তা এখন একটি নিয়মিত মূল্যবৃদ্ধির ক্যালেন্ডার তৈরি করেছে। বৈশাখের আগে দাম বাড়বে, উৎসব শেষে কমবে, এটা এখন যেন ধরেই নেওয়া হয়। এই ধারণাটা ভাঙা দরকার। ছয় লাখ জেলে, পঁচিশ লাখ পরিবহন ও বিপণন কর্মী, রফতানি আয়, জিডিপিতে অবদান, সবই এই বাজার কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। পহেলা বৈশাখ এবার শেষ হলো। কিন্তু প্রতি বছর এই একই দৃশ্য আর কত দেখতে হবে, সেটা এখন নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও আসেনি।

লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক