ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রতিটি কাজের পেছনে হাজারো নিয়ম থাকলেও অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কী করা হবে, তা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশ নেই। কোনো জিনিসের শেষ পরিণতি নির্ভর করে তার চেহারা ও মালিকের ওপর। ঐতিহাসিক গুরুত্বের কিছু জিনিস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা হলেও রাজপরিবারের সদস্যরা বাস্তববাদী। তাঁরা চান যেন প্রতিটি জিনিস নষ্ট না হয়ে সবচেয়ে ভালো কাজে লাগে।
রানির দামি পোশাক ঘর মোছার কাপড়
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ কোনো পোশাক কেবল পছন্দ হচ্ছে না বলে ফেলে দেওয়া মোটেও পছন্দ করতেন না। তাঁর মধ্যে বিশ্বযুদ্ধের সময়ের মিতব্যয়ী ও সাশ্রয়ী মানসিকতা ছিল। এ কারণেই রানির পুরোনো কাপড় কেটে নতুন পোশাক বানানোর অনেক গল্প প্রচলিত। বিশেষ করে প্রাসাদের ভেতরে নিজের মতো করে সময় কাটানোর সময় তিনি ওই পুরোনো পোশাকগুলোই বারবার পরতেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, কোনো পোশাক বারবার ব্যবহারের ফলে ছিঁড়ে গেলে বা পরার অনুপযোগী হয়ে পড়লেও তা ফেলে দেওয়া হতো না। রানি সেই কাপড়ের টুকরাগুলো ঘর মোছার কাপড় হিসেবে ব্যবহারের নির্দেশ দিতেন। কল্পনা করুন, রানির কোনো এক সময়ের মহামূল্যবান পোশাকের টুকরা দিয়েই হয়তো প্রাসাদের কর্মীরা বইয়ের তাক বা আসবাবের ধুলাবালি ঝাড়তেন।
বছরের পর বছর একই পোশাক
পোশাকের ব্যাপারে রানি এলিজাবেথের সাশ্রয়ী মনোভাব তাঁর পরিবারের অন্যদের মধ্যেও প্রভাব ফেলেছে। প্রিন্স ফিলিপ, রাজা চার্লস ও প্রিন্সেস অ্যান—একই পোশাক বারবার পরতে পছন্দ করেন। রাজা চার্লসকে প্রায়ই একটি বিশেষ ক্যামেল কোট পরতে দেখা যায়, যা তাঁর বাবার ছিল। চামড়ার বোতাম ও চমৎকার বেল্টের এই কোট চার্লস ২০২৩ সালের এক প্রার্থনা সভায়ও পরেছিলেন, যদিও তাঁর বাবা প্রিন্স ফিলিপকে প্রথম এই পোশাকে দেখা গিয়েছিল ১৯৫৬ সালে।
প্রিন্সেস অ্যানও পিছিয়ে নেই। সম্প্রতি একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে তিনি ৫৭ বছরের পুরোনো একটি কোট পরেছিলেন। সাদা রঙের এই কোট তিনি প্রথম পরেছিলেন ১৮ বছর বয়সে। ২০২৬ সালের মার্চে নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করার আগে তিনি কোটটির কলার পরিবর্তন করে সামান্য নতুন রূপ দিয়েছিলেন। তবে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন প্রিন্স ফিলিপ, যিনি তাঁর বিয়ের জুতাজোড়া টানা ৭০ বছর ব্যবহার করেছিলেন।
প্রিন্সেস ডায়ানাও পোশাক বারবার পরতে ও সেসবে নতুনত্বের ছোঁয়া দিতে পছন্দ করতেন। ১৯৮৭ সালে পর্তুগাল সফরে তিনি লম্বা হাতার একটি হালকা নীল গাউন পরেছিলেন। দুই বছর পর একটি দাতব্য অনুষ্ঠানে সেই একই গাউন দেখা যায়, তবে এবার হাতা ছিল না এবং গলার নকশায় আনা হয়েছিল পরিবর্তন। বর্তমানে পোশাকের এমন ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়েন প্রিন্সেস কেট। বড়দিন, উইম্বলডন বা বাফটার মতো বড় অনুষ্ঠানে তাঁকে প্রায়ই পুরোনো পোশাকে দেখা যায়। তাঁর কাছে এক জোড়া পেনেলোপি চিলভার্স বুট আছে, যা টানা ২২ বছর ধরে ব্যবহার করছেন।
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে রাজপরিবারের গয়না
রাজপরিবারের গয়নাগুলো সাধারণত এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘোরে। রাজমুকুটগুলো দেশের সম্পদ হিসেবে গণ্য হলেও ব্যক্তিগত গয়নাগুলোর মালিক রাজপরিবারের সদস্যরা। কয়েক প্রজন্ম ধরে চলা রাজকীয় প্রতীক ও অমূল্য গয়নার বিশাল ভান্ডার আছে তাঁদের কাছে। মজার ব্যাপার হলো, রাজপরিবারের সদস্যরা নিজেদের এই গয়নাগুলোর মালিক না মনে করে বরং রক্ষক মনে করেন, যাতে এসব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুরক্ষিত থাকে।
এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে রানি মেরির ‘লাভার্স নট টিয়ারা’। মুক্তা বসানো এই ঝলমলে মুকুট ১৯১৩ সালে রানি মেরির জন্য বানানো হয়েছিল। এরপর এটি রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, প্রিন্সেস ডায়ানা ও বর্তমানে প্রিন্সেস কেট ব্যবহার করছেন। আরেকটি গয়না রানি ভিক্টোরিয়ার স্যাফায়ার ব্রোচ, যা ১৮৪০ সালে বিয়ের আগের রাতে প্রিন্স অ্যালবার্ট ভিক্টোরিয়াকে উপহার দিয়েছিলেন। এরপর থেকে এটি পরবর্তী সব রানির কাছে হস্তান্তরিত হয়েছে। ২০২৪ সালে রানি ক্যামিলাকেও এই ঐতিহাসিক ব্রোচটি পরতে দেখা গেছে।
যেখানে সংরক্ষণ করা হয় রাজকীয় পোশাক
রানি এলিজাবেথের পোশাকগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য এতই বেশি যে সেসবের বেশির ভাগ উইন্ডসরের একটি বিশেষ আর্কাইভে অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে রাখা হয়েছে। সেখানে চার হাজারের বেশি পোশাক ও অন্যান্য জিনিস আছে। সাধারণ মানুষের জন্য এই জায়গায় প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও এ বছর রানির শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাকিংহাম প্যালেসে একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে রানির মাত্র আট বছর বয়সে পরা ব্রাইডসমেড পোশাক থেকে শুরু করে তাঁর বিয়ের রাজকীয় গাউন—সব মিলিয়ে প্রায় ২০০ দুর্লভ জিনিস দেখার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
রাজপ্রাসাদের সব জিনিসই সব সময় নিখুঁত থাকে না; মাঝেমধ্যে বিপত্তি ঘটে। রাজকীয় আর্কাইভের কিছু পুরোনো আসবাবের কাঠে পোকার ছিদ্র পাওয়া গেছে। ধারণা করা হয়, বিশেষজ্ঞদের কাছে আসার আগে সেসব কোনো অন্ধকার ঘরে অবহেলায় পড়ে ছিল। সাধারণত প্রাসাদের যেসব আসবাবের আর প্রয়োজন হয় না, সেসব রয়্যাল ট্রাস্টের আর্কাইভে বা অন্য কোনো প্রাসাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর যদি কোনো আসবাব একদমই ভেঙে যায় বা ব্যবহার করা না যায়, তাহলে সেসব ফেলে দেওয়া হয়।
চ্যারিটি শপে দান
রাজপরিবারের দামি পোশাক চ্যারিটি শপেও (দাতব্য কাজের জিনিসপত্র বিক্রির অলাভজনক দোকান) পাওয়া যায়। প্রিন্সেস ডায়ানার অনেক পোশাক মাঝেমধ্যেই এমন দোকানে পাওয়া যেত। রাজপরিবারের সদস্যরা অনেক সময় তাঁদের কর্মীদের পোশাক উপহার দেন, আর সেই কর্মীরা সেসব চ্যারিটি শপে দান করে দিতেন। ফলে কিছু পোশাক সাধারণ মানুষের কাছে চলে আসে। অনেক সময় ভাগ্যের জোরে কেউ কেউ এসব দোকান থেকে খুব সস্তায় দামি পোশাক কিনে ফেলেন। পরে পুরোনো ছবি বা ভিডিও দেখে তাঁরা আবিষ্কার করেন, এটি রাজকীয় ব্যক্তির পোশাক ছিল। এরপর কেউ কেউ সেই পোশাক নিলামে তুলে বিপুল অর্থ আয় করেছেন।
নিলামে রাজপরিবারের জিনিস ও পোশাক
১৯৯৭ সালে প্রিন্সেস ডায়ানা ক্যানসার ও এইডসের ওপর গবেষণার জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশে তাঁর ৭৯টি পোশাক নিলামে তুলেছিলেন, যা থেকে সংগৃহীত হয়েছিল প্রায় ৩০ লাখ ডলার। রাজপরিবারের অন্য সদস্যরা সাধারণত নিজেদের জিনিস হাতছাড়া করতে চান না, তবে তাঁদের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারীরা সেসব নিলামে তুলতে বাধ্য হন। ২০০৬ সালে প্রিন্সেস মার্গারেটের মৃত্যুর পর তাঁর বিখ্যাত পোলটিমোর টিয়ারা প্রায় ১৪ লাখ ডলারে বিক্রি করা হয়, তবে এই টাকা দান করা হয়নি; বরং উত্তরাধিকার কর মেটাতেই তা বিক্রি করতে হয়েছিল।
সাধারণ মানুষ কি রাজকীয় জিনিস পেতে পারে?
আপনি কি রাজকীয় স্মৃতি নিজের সংগ্রহে রাখতে চান? তবে আপনাকে হয় খুব ধনী হতে হবে, না হয় খুব সৌভাগ্যবান। ডায়ানার বিখ্যাত কালো রিভেঞ্জ ড্রেস ১৯৯৭ সালে নিলামে বিক্রি হয়েছিল ৭৪ হাজার ডলারে। ২০২৩ সালে তাঁর একটি ব্যালে-স্টাইলের গাউন বিক্রি হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ডলারে। তবে ১৯৯৬ সালে ইংল্যান্ডের বার্কশায়ারের এক দোকান সহকারী মাত্র ২০০ পাউন্ড দিয়ে একটি সিল্কের গাউন কিনেছিলেন। পরে একটি তথ্যচিত্র দেখে জানতে পারেন, পোশাকটি হুবহু প্রিন্সেস ডায়ানার বাহরাইন সফরে পরা পোশাকের মতো। পরীক্ষায় দেখা যায়, এটি আদতেই রাজকীয় পোশাক ছিল। পরবর্তী সময়ে এক জাদুঘর সেটি ২ লাখ ১০ হাজার ডলারে কিনে নেয়।
রাজপরিবারের মিতব্যয়িতার ঐতিহ্য
পুরোনো পোশাক নতুন করে পরা বা জিনিস মেরামত করে আবার ব্যবহার রাজপরিবারে নতুন কিছু নয়। তবে এই প্রথাকে আধুনিক সময়ে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও প্রিন্স ফিলিপ। তাঁরা বেড়ে উঠেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কঠিন সময়ে, যখন রেশনিং ও সীমিত সম্পদে জীবন চালানোর বাধ্যবাধকতা ছিল। যা আছে, তা দিয়েই কাজ চালানো—এই দর্শন তাঁদের বাস্তববাদী করে তুলেছিল। বিলাসিতা ও জাঁকজমকের মধে৵ বাস করেও তাঁরা এই সাধারণ জীবনবোধ হারাননি, এবং একই শিক্ষা দিয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মকে।
পরবর্তী প্রজন্মের পরিবেশ সচেতনতার পেছনে আরও একটি বড় কারণ আছে। বর্তমান রাজা চার্লস পাঁচ দশক ধরে পরিবেশ সুরক্ষা ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করছেন, এবং প্রিন্স উইলিয়ামও জলবায়ু পরিবর্তনে সচেতনতা গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছেন। তাই রাজপরিবারের মিতব্যয়ী হওয়ার এই চেষ্টা তাঁদের পরিবেশবাদী চিন্তাধারারই একটি অংশ।



