রক্তের অভাবে যেন আর কোনো প্রাণ না ঝরে: ৯ বছরের মানবতার যাত্রা
রক্তের অভাবে যেন আর কোনো প্রাণ না ঝরে: ৯ বছরের যাত্রা

রক্তের অভাবে যেন আর কোনো প্রাণ না ঝরে: ৯ বছরের মানবতার যাত্রা

২০১৮ সাল, এসএসসি পরীক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা আর স্বপ্ন নিয়ে দিন কাটছিল। সেই সময়ই প্রথম পরিচয় হয় গাজীপুরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্লাড ডোনার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে। দূর থেকে দেখতাম, তারা মানুষের জন্য রক্ত ম্যানেজ করছে, নিজেরাও রক্ত দিচ্ছে, ফ্রি ব্লাড গ্রুপ নির্ণয় ক্যাম্প করছে। সামাজিক মূল্যবোধ রেখে কাজ করছে।

তাদের কাজ আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। একদিন সাহস করে নাছির উদ্দীন নামে এক ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমি কি আপনাদের সঙ্গে কাজ করতে পারব।’ তিনি হাসলেন। বললেন, ‘মানুষের জন্য কাজ করতে চাইলে আমাদের দরজা সব সময় খোলা।’

প্রথম শিক্ষা ও একটি জরুরি মুহূর্ত

নাছির ভাই ধৈর্য ধরে আমাকে শিখিয়েছেন কীভাবে রক্তদাতার সঙ্গে কথা বলতে হয়, কীভাবে জরুরি মুহূর্তে স্থির থাকতে হয়, কীভাবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। প্রথম পরীক্ষাটা এল হঠাৎ। একদিন স্কুলে ক্লাস চলছিল। হঠাৎ ফোনকল। ফুফুর ডেলিভারির জন্য হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে বি পজিটিভ রক্ত দরকার। ফুফা অনেক জায়গায় খোঁজাখুঁজি করছেন—কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ডাক্তার জানিয়ে দিয়েছেন, রক্ত ছাড়া অপারেশন সম্ভব নয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আমি ছুটে গেলাম হাসপাতালে। চারদিকে উৎকণ্ঠা। ফুফা ভেঙে পড়েছেন। হঠাৎ মনে পড়ল আমার নিজের রক্তের গ্রুপও তো বি পজিটিভ। আমি ফুফাকে বললাম, টেনশন করবেন না, আমি দেব ব্লাড। প্রথমবার রক্ত দিতে যাচ্ছি। শরীরের ভেতরে একটু কাঁপুনি ছিল, কিন্তু মনে ভয় ছিল না। মনে হচ্ছিল আজ আমাকে সাহসী হতেই হবে। রক্ত দেওয়ার পরপরই অপারেশন শুরু হলো। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার জানালেন সবকিছু ঠিক আছে।

ফুফা আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘তোর জন্য আজ ও বেঁচে গেল।’ সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম রক্তদান মানে শুধু রক্ত দেওয়া নয়, এটি একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর অনুভূতি। শরীর দুর্বল ছিল, কিন্তু মন ছিল অদ্ভুত শক্তিতে ভরা। সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এই পথেই থাকব।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আরেকটি কান্না, আরেকটি লড়াই

একদিন ফোন এল। ওপাশে একজন মা কাঁদছেন। তাঁর মেয়ের জন্য ও নেগেটিভ রক্ত দরকার। কিডনি ডায়ালাইসিস করাতে হবে, হিমোগ্লোবিন বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে। আমি সময় নষ্ট করিনি। সঙ্গে সঙ্গে অন্তি মজুমদার নামে এক বন্ধুকে ফোন দিলাম। সে একমুহূর্ত দেরি না করে চলে এল, ব্লাড দেওয়ার জন্য। রোগীর মা কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আপনারা না থাকলে আজ আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারতাম না।’ এই কথাগুলোই আমাদের শক্তি।

৯ বছরের পথচলা: সংখ্যার গল্প নয়, মানবতার গল্প

৯ বছরের পথচলা। এই ৯ বছরে আমি নিজে ১৭ বার রক্তদান করেছি। এ পর্যন্ত ৪৩৫ ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করতে পেরেছি। ৪৩৫ মানে শুধু একটি সংখ্যা নয়। এটি ৪৩৫টি পরিবার, ৪৩৫টি গল্প এবং ৪৩৫টি নতুন সম্পর্ক। কারও কাছে ভাই হয়েছি, কারও কাছে সন্তান। এই সম্পর্কগুলো রক্তের মানবতার বন্ধনে গড়া।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশের বিভিন্ন জেলার রক্তদাতা গ্রুপে যুক্ত হয়েছি। ফেসবুক পেজ ও গ্রুপের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। এখন দেশের যেকোনো প্রান্তে রক্তের প্রয়োজন হলে চেষ্টা করি দ্রুত সংযোগ তৈরি করতে। আমি ও আমার বন্ধুরা মানবিক কাজ থামাইনি, থামাবও না।

কৃতজ্ঞতা ও অঙ্গীকার

এই দীর্ঘ যাত্রায় যাঁরা আমাকে অনুপ্রাণিত ও সহযোগিতা করেছেন—নাছির উদ্দীন, অন্তি মজুমদার, আবিদা সুলতানা, ইসমাইল হোসেন, সামিউল ইসলাম, নাজমুল হোসেন, বাইজীদ হোসেন, মশিউর রহমান, বাবুল ইসলাম, টুটুল সিকদার, আরজুদা লিমা, তামিম মল্লিক, হাসিবুল ইসলাম, লিমা পাখি, এস আর জে রাকিব, সাইমন হোসেন, বিরল আলিফ, আকন্দ হোসেন এবং আরও অনেক নাম না জানা মানুষ—সবার প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।

আমি গর্বিত যে এই পথের একজন ছোট কর্মী হতে পেরেছি। যত দিন বেঁচে থাকব, চেষ্টা করব রক্তের অভাবে যেন আর কোনো প্রাণ ঝরে না যায়। এটাই আমার গল্প। এটাই আমার লড়াই। এটাই আমার গর্ব। আমরা বিশ্বাস করি, এক ব্যাগ রক্ত মানে এক নতুন সূর্যোদয়।