লালমনিরহাটের গিলাবাড়ি গ্রামে মোগল আমলের প্রাচীন মসজিদ: শতাব্দীর ঐতিহ্য ও সংরক্ষণ উদ্যোগ
লালমনিরহাটে মোগল আমলের প্রাচীন মসজিদ: শতাব্দীর ঐতিহ্য

লালমনিরহাটের গিলাবাড়ি গ্রামে মোগল আমলের প্রাচীন মসজিদ: শতাব্দীর ঐতিহ্য ও সংরক্ষণ উদ্যোগ

লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ি ইউনিয়নের গিলাবাড়ি গ্রামে অবস্থিত মোগল আমলের একটি প্রাচীন মসজিদ কয়েক শতাব্দী ধরে ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে টিকে আছে। নিভৃত পল্লিতে অবস্থিত এই মসজিদে এখনো নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা, এবং প্রতিদিন আজানের ধ্বনিতে আশপাশের এলাকা মুখর হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের মতে, কয়েক শতাব্দী আগের ধর্মীয় কার্যক্রম এখনো প্রায় একই ধারায় অব্যাহত রয়েছে, যা এই স্থাপনার ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে।

স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য ও নির্মাণশৈলী

গিলাবাড়ি মসজিদের মূল অবকাঠামোর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪২ ফুট ও প্রস্থ ১৭ ফুট, এবং চৌহদ্দিসহ প্রায় সাত শতক জমির ওপর এটি অবস্থিত। এই প্রাচীন স্থাপনাটিতে তিনটি বড় গম্বুজ ও মোট ১২টি মিনার আছে, যার মধ্যে মূল ফটকে আরও তিনটি মিনার বিদ্যমান। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হয়েছে প্রাচীনকালের চ্যাপটা ইট, চুন ও ইটের সুরকির মিশ্রণ, যা মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বহন করে। মসজিদের চত্বরে মূল ফটকের সামনে একটি প্রাচীন ইঁদারা বা কুয়া এখনো টিকে আছে, যদিও দীর্ঘদিন ধরে এটি ব্যবহার করা না হলেও অতীতে এখান থেকে প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করা হতো।

সংরক্ষণ উদ্যোগ ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব

সম্প্রতি মসজিদের সামনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে, যা এটিকে একটি সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা উল্লেখ করে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ২০২২ সালের ১ আগস্ট জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মসজিদটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তথ্য দেওয়া আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র ও স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল মাহফুজের মতে, নির্মাণশৈলী ও উপকরণের কারণে এই মসজিদ এখনো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, এবং পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে বাইরের দেয়ালের সংস্কার করা হলেও মূল আকৃতি অক্ষুণ্ন রয়েছে।

স্থানীয় সম্পৃক্ততা ও পর্যটন সম্ভাবনা

মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. এরশাদ আলম ও স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, এলাকার পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ নামাজ পড়তে ও ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে আসেন। লালমনিরহাট জেলা জাদুঘরের পরিচালক মো. আশরাফুজ্জামান মণ্ডল সবুজের মতে, এই মসজিদ জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত। জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার উল্লেখ করেন যে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং নিদারিয়া মসজিদ, সাহাবি যুগের হারানো মসজিদসহ অন্যান্য প্রাচীন স্থাপনার পাশাপাশি পর্যটন সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে, যদিও এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।

এই প্রাচীন মসজিদটি শুধু ধর্মীয় কার্যক্রমের কেন্দ্রই নয়, বরং লালমনিরহাটের ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি জীবন্ত নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।