মেট্রোরেলে ৩০ বছর পর দেখা: অর্ধেন্দু মুখের স্মৃতি ও নীরব বিদায়
প্রতিদিনই ধাক্কা খেতে খেতে মেট্রোরেলে উঠতে হয়, বিশেষ করে পবিত্র রমজানের এই দিনগুলোয়। সবার একই সময়ে বাড়ি ফেরার তাড়ায় ভিড় আরও বেড়ে যায়, আর সেই ধাক্কাগুলো নীরবে হজম করি। ভেতরে ঢুকেও কি শান্তি মেলে? চারপাশ থেকে যেন কয়েক মেগাপ্যাস্কেল চাপ চেপে ধরে, পাঁজরের হাড়ের বক্রতা কোন দিন সরলরেখায় পরিণত হবে, তা কে জানে!
অফিসের চাপ মাথায় নিয়ে এই বৈদ্যুতিক শকটে উঠে যেন একই সঙ্গে কয়েক হাজার ভোল্টের শক খেলাম। কী এক তরঙ্গ খেলে গেল হৃদয় থেকে মস্তিষ্কে! সে কি বিদ্যুৎ-তরঙ্গ, নাকি অন্য কিছু? মনে পড়ে গেল সেই ১৯৯৬ সালের কথা, যখন তোমাকে শেষ দেখেছিলাম স্কুলে। এসেছিলে এসএসসির ফলাফল জানতে, আর হেমন্ত মুখার্জির 'আমি দূর হতে তোমারে দেখেছি' গানটি গ্রামোফোনের ভাঙা ডিস্কের মতো বুকের ভেতর একটানা বাজছিল। আজকালকার ছেলেমেয়েরা এটাকে বলে 'লুপ মোড', এক গান বারবার শোনার সেই অনুভূতি।
নোটিশ বোর্ডে নাম খুঁজে কান্না
তুমি নোটিশ বোর্ডে নামের তালিকায় তোমার নাম খুঁজে পেয়ে কেঁদে ফেলেছিলে, না, ফেল নয়, স্টার পাওনি বলে এই কান্না। সেই কান্নাভেজা চোখ, ওড়নাঢাকা অর্ধেকটা মুখ, যেন মেঘে ঢাকা আধখানা চাঁদ! আজও ঠিক সেই চাঁদের মতোই লাগছে তোমাকে। বসে আছ মেট্রোর সবুজ প্লাস্টিকের বেঞ্চিতে, তাকিয়ে আছ বাইরের পশ্চাদ্ধাবমান মিরপুরের ভবনগুলোর দিকে।
৩০ বছর পর এই দেখা। তোমার চেহারায় তেমন কোনো পরিবর্তন নেই, কেবল চোখের কোণের ত্বকে সামান্য কুঞ্চন। এদিকে আমার চুলের অর্ধেকটা ধূসর, মুখে সাদা-কালো দাড়ি-গোঁফ। কৈশোরের রঙিন দিনগুলো ফেলে এসেছি কোন সুদূরে, যেন সে আমার পূর্বের জনম। তোমার সামনেই বাদুড়ঝোলা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, তুমি দেখছও না। কথা বলব? আমার ডাকনামটা কি মনে রেখেছ?
উত্তরা স্টেশনে ফাঁকা কামরা
ভাবতে ভাবতে উত্তরা এসে গেল। রেলের কামরাটা ফাঁকা হচ্ছে, তুমি উসখুস করছ নামার প্রস্তুতিতে। তোমার পাশের সিটটা ফাঁকা হলো, আমি চাইলেই তোমার গা ঘেঁষে বসতে পারি, যেমন বসেছিলাম ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষার কোচিং ক্লাসে। মনে আছে, একটা বেঞ্চ নিয়ে কী কাড়াকাড়ি করেছিলে আমার সঙ্গে? তুমি চেয়েছিলে একা ওটায় বসতে, আমি দিইনি। আজ আমি তোমার সবুজ বেঞ্চিতে জায়গা পেয়েও দাঁড়িয়েই রইলাম, কারণ তোমার পাশে বসলে তোমার ওই অর্ধেন্দু মুখখানা এভাবে আর দেখতে পাবো না।
তোমার স্টেশনেই রেলের শেষ গন্তব্য, তুমি নেমে যাচ্ছ, আমাকেও নামতে হবে। কী আশ্চর্য, 'আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি, সেই আমাদের একটিমাত্র সুখ'! আর হয়তো দেখা হবে না। প্রতিদিন তুমি হয়তো এই রেলে যাতায়াত করো, নারীদের কামরায়। আজ ওখানে বড্ড ভিড়, বইমেলা শুরু হয়ে গেছে, তাই বাসন্তী রমণীরা ওদিকে মেলা বসিয়েছে। ভাগ্যিস ওদিকটায় আজ যাওনি।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়া ও নীরবতা
সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছ তুমি, আমিও নামছি একটু তফাতে। তোমার ছিপছিপে শরীরে আজ বয়সের ভারিক্কি, তবু যেন সেই তন্বী কিশোরী। শাড়িতে তোমাকে এই প্রথম দেখলাম, এটাই কি শেষ? ডেকে কথা বলব? কী বলব? 'কী কথা তাহার সাথে? তার সাথে!' তার চেয়ে বরং ভেবে নিই, 'রাতের সব তারাই থাকে, দিনের আলোর গভীরে'—কবিতার এই লাইনগুলো জীবনানন্দ দাশ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি জাগিয়ে তোলে।
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
