মানবসমাজে ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নটি বহু ক্ষেত্রেই প্রতিবাদ-প্রতিরোধের উচ্চকণ্ঠের আওয়াজের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। যারা যত বেশি গলা চড়িয়ে বলতে পারে, প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে—তারাই যেন বিজয়ী, তারাই যেন সবকিছুর অধিকারী। অন্যদিকে, যারা প্রতিবাদ করতে পারে না, তারাই যেন অত্যাচারের শিকার হয়।
প্রকৃতির প্রতীকী চিত্র
প্রকৃতির দিকে তাকালেই আমরা এই নির্মম সত্যের প্রতীকী চিত্র প্রত্যক্ষ করি। বৃক্ষ, যারা নীরবে ছায়া দেয়, ফল দেয়, জীবনধারণের অক্সিজেন জোগায়—তারা নিজেদের পক্ষে কোনো দাবি উত্থাপন করে না। এই নীরবতাই যেন তাদের অপরাধ। ফলস্বরূপ, কুঠারের আঘাতে তারা বিনা প্রতিরোধে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। অবলা প্রাণীরাও একই পরিণতির শিকার—তারা ভাষাহীন, সুতরাং অধিকারহীন। মানুষের নির্মিত আইন, নীতি কিংবা নৈতিকতার বৃত্তে তাদের স্থান প্রায়শই অনিশ্চিত, কারণ তারা নিজেদের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে পারে না।
মানবসমাজে প্রতিফলন
এই প্রতীকী বাস্তবতা মানবসমাজে আরও জটিল আকারে প্রতিফলিত হয়। এখানে মানুষই মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়; কিন্তু শক্তির ভারসাম্য সর্বদা সমান থাকে না। যে মানুষ ক্ষমতার নির্ণায়ক বৈশিষ্ট্যগুলি ধারণ করতে পারে না—অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল, সামাজিকভাবে প্রান্তিক, কিংবা সাংস্কৃতিকভাবে নিঃশব্দ—তারা যেন একপ্রকার প্রতিবাদহীন 'বৃক্ষ' বা 'অবলা প্রাণী'। তাদের উপর অত্যাচার চলতে থাকে, কারণ তারা প্রতিবাদ করতে অক্ষম, অথবা প্রতিবাদের পরিণতি তাদের জন্য আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সভ্যতার সংকট
এইখানেই সভ্যতার এক গভীর সংকট উদ্ভাসিত হয়। আমরা নিজেদের উন্নত, মানবিক ও ন্যায়পরায়ণ বলে দাবি করি; কিন্তু বাস্তবে শক্তির অসম বণ্টনই নির্ধারণ করে কে কার উপর অত্যাচার করবে। প্রতিবাদের ক্ষমতা এখানে একপ্রকার মুদ্রা। এটি যার কাছে আছে, তিনি নিরাপদ; যার নেই, তিনি অনিরাপত্তার স্থায়ী নাগরিক।
প্রশ্ন ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা
কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে—মানুষ কেন এমন এক কাঠামো নির্মাণ করল, যেখানে নীরবতা শাস্তিযোগ্য এবং প্রতিবাদের তীব্র উচ্চারণ পুরস্কৃত হয়? এর একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা রয়েছে। ক্ষমতা স্বভাবতই প্রতিরোধহীন ক্ষেত্র খোঁজে। যেখানে বাধা কম, সেখানেই দখল সহজ। ফলে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী প্রতিবাদ করতে পারে না, তার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা যায় সহজে। এই প্রবণতা কেবল ব্যক্তি পর্যায়ে নয়; রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, এমনকি আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও পরিলক্ষিত হয়।
সামাজিক অসচেতনতা
তবে এটি কেবল নিষ্ঠুরতার গল্প নয়। এটি একপ্রকার সামাজিক অসচেতনতারও চিত্র। অনেক সময় অত্যাচারী ব্যক্তি নিজেও বুঝতে পারে না যে, সে অন্যায়ের অংশীদার হচ্ছে। কারণ সমাজ তাকে শিখিয়েছে—'যে চুপ থাকে, সে সহ্য করার জন্যই আছে।' এই ধারণা যতদিন অটুট থাকবে, ততদিন নীরবদের প্রতি নির্যাতন অব্যাহত থাকবে।
সমাধানের পথ
অতএব, সমাধান কেবল প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি প্রতিবাদের ধারণাটিকেই পুনর্বিবেচনার দাবি করে। প্রত্যেকের পক্ষে উচ্চকণ্ঠ হওয়া সম্ভব নয়; কিন্তু সমাজের দায়িত্ব হলো সেই নীরবতার ভাষা অনুবাদ করা। এখানে নৈতিকতার একটি সূক্ষ্ম কিন্তু মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের বিচারবোধকে কেবল উচ্চারিত শব্দের উপর নির্ভর করলে চলবে না—বরং অনুচ্চারিত সংকেত, নীরব আর্তনাদ এবং অদৃশ্য বঞ্চনাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নীরবদের কণ্ঠস্বর
যে সমাজ নীরবদের কণ্ঠস্বর শুনতে শেখে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে ন্যায়ভিত্তিক সমাজে পরিণত হয়। সুতরাং, বৃক্ষ ও অবলা প্রাণীর এই প্রতীকী চিত্র আমাদের কেবল সহানুভূতির আহ্বান জানায় না—এটি আমাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্নও তোলে। আমরা কি কেবল শক্তিশালীদের ভাষাই শুনব, নাকি দুর্বলদের নীরবতাকেও ভাষা দান করব?
স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ
বাস্তবিক অর্থে, যে সমাজে প্রতিবাদের ক্ষমতাই বেঁচে থাকার শর্ত, সেই সমাজ প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নয়। স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন নীরবরাও নিরাপদ থাকবে—যখন প্রতিবাদ না করলেও কেউ নির্যাতনের শিকার হবে না। এই আদর্শ হয়তো তৃতীয় বিশ্বের সমাজে প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়; কিন্তু এটি ব্যতীত একটি রাষ্ট্র, একটি সমাজ, নিজেকে কী করে সভ্য বলবে?



