দাম্পত্য জীবনের ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝি ও মায়ার গল্প
বিকেলের রোদে ড্রয়িংরুমের কোনায় ধুলোমাখা রোদের রেখা এসে পড়েছে। আনিস সাহেব সোফায় বসে পুরোনো পত্রিকা পড়ছেন। সাহিত্য আর ফিচার পাতায় তার বেশি আগ্রহ। রান্নাঘর থেকে শায়লার কাশির শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিন দিন ধরে স্বামীর সঙ্গে কথা বলেন না তিনি। ঝগড়া হয়েছিল তুচ্ছ কারণে। আনিস সাহেব অফিস থেকে ফেরার সময় শায়লার পছন্দের দোকানের শিঙাড়া আনতে ভুলে গিয়েছিলেন।
শিঙাড়া না আনার ঘটনা ও নীরবতার যুদ্ধ
‘তুমি আসলে আমাকে গুরুত্বই দাও না। মনে রাখার কোনো ইচ্ছাই তোমার নেই।’ শায়লা বলেছিলেন। আনিস সাহেব উত্তর দিয়েছিলেন, ‘শায়লা, একটা শিঙাড়া না আনা কি গুরুত্ব না দেওয়ার প্রমাণ? পথে খুব জ্যাম ছিল, ভুলে গেছি।’ শায়লা এক মুহূর্ত চুপ থেকে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘মানুষ ভুলে যায় তখনই, যখন তার কাছে সেই মানুষটার চেয়ে জ্যাম বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়।’ সেই থেকে নিস্তব্ধতা। চিৎকার করলে বরং শান্তি পাওয়া যায়, কিন্তু এই যে ঘরের ভেতর দিয়ে দুজন মানুষ ছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ কেউ কাউকে দেখছে না—এটা অসহ্য।
চায়ের ট্রে ও বিস্কুট না থাকার সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ
বিকেল পাঁচটা বাজতেই শায়লা চা নিয়ে এলেন। ট্রেতে দুটো কাপ। বিস্কুট নেই। আনিস সাহেব বুঝলেন, শাস্তির মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। বিস্কুট না থাকাটা একটা সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ। চুমুক দিয়ে বললেন, ‘চিনিটা একটু কম হয়েছে মনে হয়।’ শায়লা কোনো উত্তর না দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলেন। আনিস সাহেব আবার বললেন, ‘শোনো, আজ অফিসে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। আমাদের ম্যানেজার সাহেব হুট করে পদত্যাগ করেছেন।’ শায়লা খানিক মুচকি হেসে বললেন, ‘লোকটা খুব অদ্ভুত ছিল, না?’ আনিস সাহেব মাথা নাড়লেন। শায়লা মুখ ফিরিয়ে শীতল গলায় বললেন, ‘ম্যানেজার সাহেবের অদ্ভুত হওয়া নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। চা শেষ হলে কাপটা টেবিলে রেখো।’
পুরোনো শাড়ি ও স্মৃতির আলোকে মায়ার কথা
আনিস সাহেব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘তুমি কি এখনো শিঙাড়ার জন্য রাগ করে আছ? গতকাল কিন্তু এক ঠোঙা নিয়ে এসেছি, তুমি তো ছুঁয়েও দেখলে না।’ শায়লা বললেন, ‘আমি শিঙাড়ার জন্য রাগ করিনি আনিস। রাগ করেছি তোমার অবহেলার জন্য। তুমি যখন ভুলে যাও, তখন আসলে বুঝিয়ে দাও যে আমার ছোট ছোট চাওয়া তোমার কাছে মানে রাখে না।’ আনিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মেয়েদের এই লজিক তিনি কোনো দিন বুঝতে পারেননি। শিঙাড়া থেকে অবহেলা, অবহেলা থেকে অস্তিত্বের সংকট—এই বিবর্তন ডারউইনের থিওরির চেয়েও জটিল।
সন্ধ্যায় বৃষ্টি শুরু হলো। আনিস সাহেব ড্রয়ার পরিষ্কার করছিলেন। শায়লা বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিলেন। বইয়ের পাতা ওলটানোর শব্দ ছাড়া ঘরে কোনো শব্দ নেই। ড্রয়ারের একদম নিচে একটা নীল রঙের শাড়ি পাওয়া গেল। শাড়িটা দেখে আনিস সাহেব থমকে গেলেন। শাড়িটা তিনি শায়লাকে বিয়ের দ্বিতীয় বছরে উপহার দিয়েছিলেন। তখন খুব টানাটানির সংসার। বেতনের অর্ধেক টাকা জমিয়ে শাড়িটা কিনেছিলেন। ‘এই শাড়িটার কথা মনে আছে শায়লা?’ শায়লা বই থেকে চোখ সরিয়ে তাকালেন, ‘মনে থাকবে না কেন? সস্তা সিনথেটিক শাড়ি, পরলে গায়ে চুলকায়।’ আনিস সাহেব খানিক হাসলেন। বললেন, ‘সস্তা হতে পারে, কিন্তু এটা কেনার পর তুমি সারা রাত আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলে। মনে নেই?’ শায়লা এবার উঠে বসলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘মানুষ ছোটবেলায় কাদা দিয়ে ভাত রাঁধে, তার মানে এই নয় যে বড় হয়েও কাদা দিয়ে ভাত রাঁধবে। রুচি বদলায়।’
ভয় ও মায়ার কথোপকথন
আনিস শাড়িটা ভাঁজ করতে করতে বললেন, ‘রুচি বদলায়, কিন্তু মায়া কি বদলায়? আমার মনে আছে, এই শাড়িটা পরে তুমি যখন প্রথম বারান্দায় দাঁড়ালে, মনে হয়েছিল আকাশটা বুঝি নিচে নেমে এসেছে। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে আমি তোমাকে ভয় পেতে শুরু করি।’ শায়লা ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘ভয়! কেন?’ ‘কারণ, আমি বুঝেছিলাম, তোমার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। কোনো মানুষের ওপর এত মায়া থাকা ভালো না। মায়া মানুষকে দুর্বল করে দেয়।’ শায়লা কিছু বললেন না। আবার বইয়ে মন দিলেন। আনিস সাহেব লক্ষ করলেন, শায়লা বইয়ের পাতা আর ওলটাচ্ছেন না।
বৃষ্টির সন্ধ্যায় খিচুড়ির ইচ্ছা ও মিলনের মুহূর্ত
রাত বাড়ছে। বৃষ্টির শব্দ এখন বেশ ছন্দময়। আনিস সাহেব জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। অন্ধকারে বাইরের গাছগুলোকে ভূতের মতো দেখাচ্ছে। শায়লা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে পাশে এসে দাঁড়ালেন। আনিস সাহেব বললেন, ‘বৃষ্টির সময় খিচুড়ি খেতে ইচ্ছে করছে। তোমার হাতের সেই ঝাল খিচুড়ি আর ডিমভাজি।’ ‘এখন রাত দশটা বাজে। এই সময়ে খিচুড়ি রান্না সম্ভব নয়। ফ্রিজে ডাল আছে, খেয়ে নাও।’ আনিস সাহেব একটু ব্যথিত হলেন। পরক্ষণেই শায়লা আলতো করে হাতটা ধরলেন। হাতের স্পর্শ খুব হালকা, কিন্তু তাতে অনেক না–বলা কথা যেন মিশে আছে। শায়লা মুচকি হেসে বললেন, ‘কাল সকালে খিচুড়ি করে দেব মিস্টার আনিস। এখন শুয়ে পড়ো। সকালে তোমার অফিস আছে।’ ‘শিঙাড়ার অপরাধ কি ক্ষমা হয়েছে?’ ‘না, হয়নি। শিঙাড়া কাল তোমাকে আবার আনতে হবে। আর শোনো, ওই নীল শাড়িটা আলমারির ওপরের তাকে তুলে রেখো। ওটা কাল দুপুরে পরব।’ আনিস সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ‘কিন্তু ওটা পরলে তো গায়ে চুলকায়!’ ‘চুলকাক। কিছু কষ্ট সহ্য করা ভালো। সব আরামদায়ক হতে হবে এমন তো কথা নেই।’
মান-অভিমানের বরফ গলার শুরু
মান-অভিমানের বরফ গলতে শুরু করেছে। মানুষের সম্পর্ক বড় অদ্ভুত। খুব ছোট ছোট জিনিসে এই সম্পর্ক তাসের ঘরের মতো ভেঙে যায়, আবার খুব তুচ্ছ একটা স্মৃতি বা স্পর্শে তা পাহাড়ের মতো অটল হয়ে দাঁড়ায়। আনিস সাহেব শুয়ে পড়েছেন। শায়লা পাশের রুমে আলমারি গোছাচ্ছেন। বৃষ্টির শব্দ কমে আসছে। আনিস সাহেব ভাবছেন, কাল অফিসে যাওয়ার পথে নীল শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং করা একটা নীল টিপ কিনে আনবেন। শায়লা টিপ পরতে পছন্দ করে না, কিন্তু যখন পরে, তখন ঠিক সেই কুড়ি বছর আগের রোকেয়া হলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা চঞ্চল মেয়েটির মতো দেখায়।
অন্ধকারে শেষ কথোপকথন
শায়লা ঘরে ঢুকে লাইট বন্ধ করে দিলেন। অন্ধকারে গলার স্বর শোনা যাচ্ছে, ‘শুনছ?’ ‘হুঁ।’ ‘কাল কিন্তু শিঙাড়া আনতে ভুলো না। জ্যামের দোহাই দেবে না। জ্যাম থাকলে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে আসবে।’ আনিস সাহেব হাসলেন। অন্ধকারে হাসি দেখা যায় না, কিন্তু অনুভব করা যায়। তিনি জানেন, কাল হয়তো আবারও ভুলে যাবেন, কিংবা সত্যিই জ্যাম থাকবে। অবশ্য তাতে কিছু যায়–আসে না। এই ভুল–বোঝাবুঝি, নীরবতা, এই ছোট দাবিগুলোই তো জীবন। বিছানার পাশে রাখা ঘড়িটা টিক টিক করে চলছে। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু…



