শতবর্ষী বিল্বগ্রাম হাট: অশ্বত্থগাছের ছায়ায় গ্রামীণ জীবনের ছন্দ
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত শতবর্ষী বিল্বগ্রাম হাট আজও গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ ধারণ করে আছে। অশ্বত্থগাছের ছায়ায় টাটকা শাকসবজি, ফলমূলসহ নানা পণ্যের পসরা নিয়ে বসেছেন ভাসমান দোকানিরা। কাপড়ের শামিয়ানা ও পলিথিনের ছাউনির নিচে গড়ে ওঠা এসব অস্থায়ী দোকানে ক্রেতাদের ভিড় লক্ষণীয়।
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব
বিল্বগ্রাম বাজার শুধু গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্মারক নয়; এখানে ধর্মীয় সম্প্রীতির ছবিটাও স্পষ্ট। বাজারের পশ্চিম পাশে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে একটি মসজিদ ও একটি কালীমন্দির। আজানের ধ্বনি আর মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি মিলেমিশে এক নীরব সহাবস্থানের বার্তা দেয়। স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহজাহান মিয়া (৭৬) বলেন, ‘আমার জন্মের পর থেকে এই বাজার দেখছি। গৌরনদী এলাকার সবচেয়ে পুরোনো বাজারের একটি এটি।’ তিনি উল্লেখ করেন, বাজারটি যুগ যুগ ধরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে, বিশেষ করে এখানকার চাষের মাছ ও পান বিখ্যাত।
নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সরকারি উদ্যোগ
বিল্বগ্রাম হাটে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো। বাজারে নারীদের জন্য একটি আলাদা একতলা মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অর্থায়নে নারীদের স্বাবলম্বী করতে মার্কেটটি তৈরি করা হয়। এখানে চারজন নারী কসমেটিকস, তৈরি পোশাক, হোমিও চিকিৎসকের চেম্বার ও বিউটি পারলার দিয়ে ব্যবসা করছেন। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক রেখা রানী দাস বলেন, ‘সরকার আমাদের এই মার্কেট করে একটি কক্ষ বরাদ্দ দিয়েছে। এখন মাসে ৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে আমরা ব্যবসা করে পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে আছি।’
মাছ ও কৃষিপণ্যের সমাহার
বাজারে ঢুকতেই দেখা যায় দুই গলির মাঝখানে একটি বড় খোলা মাঠ, যেখানে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ হয়। মার্কেটের দক্ষিণ পাশে সামুদ্রিক ও স্থানীয় বিল-ঘেরে চাষ করা মাছ বিক্রির দুটি বড় শেড আছে। রুই, কাতল, মৃগেল, সিলভার কার্প, পাঙাশ, তেলাপিয়া, শোল, কই, শিং, মাগুরসহ হরেক রকম মাছের পসরায় মুখর পুরো এলাকা। অশ্বত্থগাছের নিচে খোলা মাঠজুড়ে শাকসবজি আর ফলের পসরা নিয়ে বসেছেন অস্থায়ী ব্যবসায়ীরা। লাউ, কুমড়া, শিম, বেগুন, মরিচ, শাকের আঁটি—সবই স্থানীয় খেত আর বাড়ির আঙিনার ফসল।
গ্রামীণ হাটের বৈশিষ্ট্য ও ভবিষ্যৎ
বেলাল হোসেন নামের এক ভাসমান সবজি ব্যবসায়ী বলেন, ‘শনি ও মঙ্গলবার আমাদের ভাসমান হাট বসে। এটা এই অঞ্চলের পুরোনো বড় বাজার, বেচাবিক্রিও খুব ভালো।’ হাটের এক প্রান্তে পানপাতার গাঢ় সবুজ স্তূপ, অন্য প্রান্তে রুপালি আঁশের ঝিলমিল করা তাজা মাছের সারি—এই দুই বিপরীত অথচ পরিপূরক দৃশ্য মিলেই বিল্বগ্রাম হাটের আসল রূপ ফুটে ওঠে। আধুনিকতার কোলাহলের মধ্যেও এই হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি গ্রামবাংলার জীবনের ছন্দ, স্মৃতি আর জীবিকাকে একসুতায় গেঁথে রাখা এক জীবন্ত দৃশ্যপট।
