প্রবীণদের ডিজিটাল জীবন: সুযোগ ও চ্যালেঞ্জের দ্বৈততা
একসময় মনে করা হতো, মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শুধুমাত্র শিশু-কিশোরদেরকেই প্রভাবিত করছে। মার্কিন সমাজমনোবিজ্ঞানী জোনাথন হেইথের মতো বিশেষজ্ঞরা স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়াকে 'উদ্বিগ্ন প্রজন্ম' তৈরির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে।
স্ক্রিনের দিকে প্রবীণদের ঝোঁক
অবসরপ্রাপ্ত ও বয়স্ক ব্যক্তিরা এখন দিনের জেগে থাকা সময়ের অর্ধেকের বেশি স্ক্রিনের সামনে কাটাচ্ছেন। বহু বছর ধরে টেলিভিশনের নিষ্ঠ দর্শক ছিলেন যারা, তাদের তালিকায় এখন যোগ হয়েছে স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, ভিডিও গেমস ও বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস। এই ডিজিটাল রূপান্তর পুরোপুরি নেতিবাচক নয় বরং অনেক ক্ষেত্রে আশীর্বাদস্বরূপ।
ডিজিটাল সুবিধাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দূরের আত্মীয়-স্বজন ও পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ
- ঘরে বসেই চিকিৎসক পরামর্শ, কেনাকাটা ও সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ
- বিনোদনের অসীম সম্ভাবনা: সিনেমা দেখা, গান শোনা, বই পড়া সবই হাতের নাগালে
- বাজারে যাওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি ও সময় সাশ্রয়
নিউজ ব্যবহারে প্রবীণদের আধিপত্য
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রবীণরা তরুণদের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ মাধ্যম ব্যবহার করেন। কিন্তু এই উচ্চ ব্যবহারের পাশাপাশি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভুয়া তথ্য ও গুজবের প্রতি তাদের অত্যধিক সংবেদনশীলতা। আগে যারা প্রথম আলো বা বিবিসির মতো প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম থেকে খবর গ্রহণ করতেন, এখন অনেকেই সময় কাটান ইউটিউব, টিকটক বা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে।
অনলাইন ঝুঁকি ও প্রতারণা
অনলাইন জগতে প্রবীণদের জন্য বিশেষ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে:
- জালিয়াতি ও স্ক্যাম: প্রবীণরা অনলাইন প্রতারণা শনাক্ত করতে তরুণদের মতো দক্ষ নন
- ভুয়া বিনিয়োগ ও প্রতারণামূলক লিংক: বিশেষভাবে বয়স্কদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়
- এআই তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট: শিশু-কিশোররা সহজে শনাক্ত করতে পারলেও বয়স্করা পারেন না
- সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব: শিশুদের জন্য সুরক্ষা নীতিমালা থাকলেও বয়স্কদের জন্য তেমন উদ্যোগ নেই
একাকিত্ব ও স্ক্রিনের দ্বৈত সম্পর্ক
একাকিত্বের ক্ষেত্রে স্ক্রিনের প্রভাব দ্বিমুখী। নিঃসঙ্গ মানুষের জন্য স্ক্রিন একপ্রকার সঙ্গী হিসেবে কাজ করে, কিন্তু যখন এটি বাস্তব সম্পর্কের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তখন সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ে। অনলাইনে কেনাকাটা ও যোগাযোগ সম্ভব হলেও পাশের মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক কথোপকথন কমে যাচ্ছে।
সমাধানের পথ
শুধুমাত্র শিশু-কিশোরদের স্ক্রিন টাইম নিয়ে চিন্তা করার সময় শেষ। এখন বয়স্কদের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সচেতনতা বৃদ্ধির উপর সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যদের উচিত প্রবীণ সদস্যদের অনলাইন নিরাপত্তা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়া এবং ভুয়া তথ্য চিহ্নিত করতে সহায়তা করা।
পরেরবার যখন কোনো শিশুকে ফোন ব্যবহার কমাতে বলা হবে, তখন হয়তো সে দাদু-দাদির দিকেও তাকাবে, যারা ফেসবুকে নতুন মিম দেখে হাসছেন অথবা ইউটিউবে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখে চিন্তিত হচ্ছেন। প্রবীণদের ডিজিটাল রূপান্তরকে ইতিবাচকভাবে পরিচালনা করাই এখন সময়ের দাবি।
