বরিশালে ভাষা শহীদদের স্মরণে ৪৫ ফুট কাপড়ে শিশুদের চিত্রাঙ্কন, ফুটে উঠেছে আন্দোলনের ইতিহাস
বরিশালে ভাষা শহীদদের স্মরণে ৪৫ ফুট কাপড়ে শিশুদের চিত্রাঙ্কন

বরিশালে ভাষা শহীদদের স্মরণে শিশুদের হাতে ৪৫ ফুট কাপড়ে চিত্রাঙ্কন

মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বরিশালে শুরু হয়েছে এক অনন্য শৈল্পিক আয়োজন। ‘একুশের ক্যানভাস’ শিরোনামে ৪৫ ফুট দীর্ঘ একটি কাপড়ের ওপর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ফুটিয়ে তুলেছে শিশু-কিশোর ও তরুণ শিল্পীরা। শুক্রবার সকালে চারুকলা বরিশালের উদ্যোগে এই ব্যতিক্রমী চিত্রাঙ্কন কর্মসূচি আয়োজিত হয় ভাষা শহীদদের স্মরণে ও নতুন প্রজন্মকে শিক্ষিত করতে।

ইতিহাসের চলমান দলিল হয়ে উঠল ক্যানভাস

বরিশাল নগরের সিটি কলেজ প্রাঙ্গণে সাদা কাপড়টি মেলে ধরা হলে তা যেন এক বিশাল নীরব পৃষ্ঠায় পরিণত হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই রং, রেখা ও তুলির স্পর্শে এটি ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিলে রূপ নেয়। শিশু থেকে তরুণ শিল্পীদের অংশগ্রহণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ও ঘটনাবলি।

এই ইতিহাসভিত্তিক চিত্রাঙ্কনের দলনেতা তাপস কর্মকার জানান, ‘এই দীর্ঘ কাপড়চিত্রটি মহান একুশ উপলক্ষে আঁকা সবচেয়ে বড় কাপড়চিত্র। সাতটি আলাদা ছবির মাধ্যমে আমরা ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরেছি, যাতে নতুন প্রজন্ম পুরো ঘটনাপ্রবাহ সহজে বুঝতে পারে।’

শিশুদের হাতে ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ

ক্যানভাসে ১৯৫২ সালের উত্তাল মিছিল, পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং শহীদ মিনারে ফুল হাতে মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের মতো দৃশ্যগুলো অঙ্কিত হয়েছে। প্রতিটি ফ্রেম যেন একেকটি সময়ের জানালা, যা দর্শকদের ইতিহাসের গভীরে নিয়ে যায়। আয়োজনের সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া দৃশ্য ছিল মায়ের কোলে বসে এক শিশু, যেন ছবির ভেতরেই শুনছে ভাষা আন্দোলনের গল্প।

খুদে ও তরুণ শিল্পীরা রঙে-রূপে-রেখায় দৃশ্যগুলো এমনভাবে নির্মাণ করেছেন যে ইতিহাস কেবল তথ্য নয়, অনুভূতির বিষয় হয়ে ওঠে। এই অনুভূতি একটি জাতির আত্মপরিচয় গড়ে তোলে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মূল্যবোধ পৌঁছে দেয়।

দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা শিশুশিল্পীদের অংশগ্রহণ

এই আয়োজনে অংশ নিতে দূরবর্তী এলাকা থেকেও এসেছে শিশুশিল্পীরা। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলা থেকে আসা শিশুশিল্পী আহাদ আবদুল্লাহ বলে, ‘কাপড়চিত্র অঙ্কনের জন্য মঠবাড়িয়া থেকে এসেছি। এখানে এসে খুব আনন্দ লাগছে।’ শিশুরা জানায়, তারা এই কাজে অংশ নিতে পেরে খুব খুশি এবং অনেকেই প্রথমবারের মতো এত বড় ক্যানভাসে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে।

চারুকলা বরিশালের সংগঠক সুশান্ত ঘোষ বলেন, ‘ভাষাশহীদদের স্মরণ মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়, তাঁদের স্বপ্ন ও সংগ্রামের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। ৪৫ ফুট দীর্ঘ এই কাপড়চিত্র শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়; এটি এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ইতিহাস হস্তান্তরের এক সৃজনশীল সেতুবন্ধ।’

সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রশংসা

বরিশাল জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা এই আয়োজনকে অবিশ্বাস্য ও ব্যতিক্রমী উল্লেখ করে বলেন, ‘এভাবে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে রঙের মধ্যে ফুটিয়ে তোলা সত্যিই অসাধারণ এক উদ্যোগ। এর মধ্য দিয়ে মনে হচ্ছে, আমরা শুধু অতীতের গল্প দেখছি না, বরং সেই চেতনা ও সংগ্রামের অংশ হয়ে যাচ্ছি।’

চিত্রাঙ্কন শেষে কাপড়ের ক্যানভাসটি নগরের সদর রোডের অশ্বিনীকুমার হলের সামনে প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। সংগঠনের শিল্পীরা জানান, শুক্রবার রাতে বরিশাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনের সড়কে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস উপলক্ষে তারা প্রতিবছরের ন্যায় আলপনা অঙ্কন করবেন।