পোষা কুকুরের লালা থেকে সেপসিস: যুক্তরাজ্যের নারীর অঙ্গহানি ও জীবন-মৃত্যুর লড়াই
কুকুরের লালা থেকে সেপসিস: যুক্তরাজ্যে নারীর অঙ্গহানি

পোষা কুকুরের লালা থেকে মারাত্মক সংক্রমণ: যুক্তরাজ্যে নারীর জীবন-মৃত্যুর সংগ্রাম

একটি ছোট আঁচড় বা ত্বকের ক্ষত—পোষা প্রাণী পালনকারী অনেক পরিবারের জন্য এটি নিত্যদিনের সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এই সামান্য বিষয়টিই কখনো কখনো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। যুক্তরাজ্যের ৫২ বছর বয়সি মনজিৎ সাংহার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা তারই জীবন্ত প্রমাণ।

২৪ ঘণ্টায় জীবন বদলে যাওয়ার গল্প

২০২৫ সালের জুলাই মাসে কাজ থেকে বাড়ি ফেরার পর হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন মনজিৎ সাংহা। পরদিন সকালে তাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। তার হাত-পা বরফশীতল, ঠোঁট বেগুনি হয়ে উঠেছিল এবং শ্বাস নিতে মারাত্মক কষ্ট হচ্ছিল। পরিস্থিতি এত দ্রুত অবনতি হয় যে পরিবারের সদস্যরা বুঝে ওঠার আগেই তিনি কোমায় চলে যান।

বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার স্বামী কমলজিৎ সাংহা বলেন, "মাত্র ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের ব্যবধানে সবকিছু বদলে গেল। শনিবার কুকুরের সঙ্গে খেলেছেন, রোববার কাজেও গেছেন, আর সোমবার রাতেই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে গেছেন।"

চিকিৎসকদের জরুরি সিদ্ধান্ত: অঙ্গহানি

মনজিৎ সাংহাকে দ্রুত নিউ ক্রস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সংক্রমণ এতটাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে চিকিৎসকদের একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে তার দুই হাত এবং হাঁটুর নিচ থেকে দুই পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন তারা।

দীর্ঘ ৩২ সপ্তাহ হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেন মনজিৎ। এই সময়ে তিনি ছয়বার হৃদরোগে আক্রান্ত হন এবং তার প্লীহাও অপসারণ করতে হয়। চিকিৎসকদের ধারণা, শরীরের কোনো ছোট ক্ষত বা আঁচড়ে পোষা কুকুরের লালা লাগার মাধ্যমেই এই মারাত্মক সংক্রমণের সূত্রপাত ঘটে।

Capnocytophaga canimorsus: কুকুরের মুখের নীরব ঘাতক

কুকুরের মুখে থাকা Capnocytophaga canimorsus নামের ব্যাকটেরিয়া সাধারণত প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে এটি যদি মানুষের রক্তে প্রবেশ করে, তাহলে দ্রুত মারাত্মক সংক্রমণ, সেপসিস এমনকি মৃত্যুও ঘটাতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া মানুষের ত্বকের ক্ষত বা শ্লেষ্মা ঝিল্লির মাধ্যমে রক্তপ্রবাহে ঢুকে পড়তে পারে।

এই ঘটনা পোষা প্রাণীপ্রেমীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বহন করে—পোষা প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থাকলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা কতটা জরুরি। বিশেষ করে কুকুরের লালার সংস্পর্শে আসার পর হাত ধোয়া এবং যেকোনো ক্ষত বা আঁচড়কে গুরুত্ব সহকারে নেওয়া প্রয়োজন।

সেপসিস: জীবনসংকটাপন্ন অবস্থা

সেপসিস হলো শরীরে কোনো সংক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হওয়া একটি জীবন সংকটাপন্ন অবস্থা। এটি শরীরে এমন একটি বিক্রিয়া তৈরি করে যার ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে সুস্থ টিস্যু ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ধ্বংস করতে শুরু করে। এর ফলে সারা শরীরে ব্যাপক প্রদাহ ছড়িয়ে পড়ে এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে শুরু করে।

সেপসিসের প্রধান কারণসমূহ

ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, সেপসিসের প্রধান কারণ হল ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ। তবে ছত্রাক, পরজীবী বা ভাইরাসের কারণেও এটি হতে পারে। সাধারণত যেসব সংক্রমণ থেকে সেপসিস হয়:

  • ফুসফুসসহ শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ
  • মূত্রনালির সংক্রমণ
  • পরিপাকতন্ত্রের সংক্রমণ
  • কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বা মস্তিষ্কের সংক্রমণ
  • ত্বকের সংক্রমণ

সেপসিসের সতর্কতা লক্ষণ

সেপসিসের কিছু সাধারণ লক্ষণ যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত:

  1. ত্বকে লালচে বা বিবর্ণ র্যাশ হওয়া
  2. শরীরে ছোট ছোট গাঢ় লাল ছোপ দেখা দেওয়া
  3. প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা বারবার প্রস্রাবের তাগিদ
  4. প্রচণ্ড অবসাদ ও দুর্বলতা
  5. হৃৎস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া
  6. রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা
  7. তীব্র ব্যথা অনুভূত হওয়া

সেপসিসের সম্ভাব্য জটিলতাসমূহ

সেপসিস থেকে বিভিন্ন প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি হতে পারে:

সেপটিক শক: সেপসিসের ফলে রক্তচাপ হঠাৎ করে বিপজ্জনকভাবে কমে গেলে অঙ্গপ্রত্যঙ্গে রক্তপ্রবাহ ব্যাহত হয়। অক্সিজেনের অভাবে টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দ্রুত একাধিক অঙ্গ বিকল হতে পারে।

অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিস্ট্রেস সিনড্রোম (ARDS): সেপসিসের কারণে ফুসফুসে তরল জমে অক্সিজেন আদান-প্রদান মারাত্মকভাবে কমে যায়। এতে তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং রোগীকে ভেন্টিলেশনের প্রয়োজন হতে পারে।

ডিসেমিনেটেড ইনট্রাভাসকুলার কোয়াগুলেশন (DIC): এই অবস্থায় শরীরজুড়ে অস্বাভাবিক রক্ত জমাট বাঁধে। ফলে জমাট বাঁধার উপাদান দ্রুত শেষ হয়ে যায় এবং ব্যাপক রক্তক্ষরণ শুরু হয়।

অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি: রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়া, বিষাক্ত উপাদান ও প্রদাহের কারণে কিডনি বিকল হতে পারে। অক্সিজেনের অভাবে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হতে পারে।

পোস্ট-সেপসিস সিনড্রোম (PSS): সেপসিস থেকে সেরে ওঠা বহু রোগী দীর্ঘমেয়াদি ক্লান্তি, মানসিক অবসাদ এবং স্মৃতিভ্রমের মতো সমস্যায় ভোগেন। অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি, ট্রমা-পরবর্তী মানসিক চাপের মতো উপসর্গ এবং বারবার সংক্রমণের ঝুঁকিও থাকতে পারে।

মনজিৎ সাংহার মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা আমাদের সবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেছে। পোষা প্রাণীর সঙ্গে সময় কাটানোর সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, যেকোনো ক্ষত বা আঁচড়কে গুরুত্ব দেওয়া এবং সেপসিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনতে পারা জীবন বাঁচাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, পোষা প্রাণীর লালার সংস্পর্শে আসার পর অবশ্যই হাত ধুয়ে ফেলতে হবে এবং শরীরে কোনো ক্ষত থাকলে তা যথাযথভাবে পরিষ্কার ও সুরক্ষিত রাখতে হবে।