কেরানীগঞ্জে কলাতিয়া খাল: খননকাজের মধ্যেই পরিবেশ বিপর্যয়ের মহোৎসব
নদী বা খাল খননের মূল উদ্দেশ্য হলো তার নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং পানিপ্রবাহ সচল রাখা। কিন্তু রাজধানী ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার কলাতিয়া খালের বর্তমান পরিস্থিতি এক কথায় ‘প্রহসন’ ছাড়া আর কিছুই নয়। একদিকে সরকারি অর্থ ব্যয় করে খালটি পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে, অন্যদিকে অন্য প্রান্ত দিয়ে ময়লা-আবর্জনা ফেলে ভরাট ও দূষণের মহোৎসব অব্যাহত রয়েছে। এটি আমাদের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং নাগরিক অসচেতনতার একটি চরম প্রতিফলন হিসেবে দেখা দিয়েছে।
খননকাজের মধ্যেই ময়লার ভাগাড়ে পরিণত খাল
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৬ মার্চ থেকে সারা দেশে জলাধার রক্ষার অংশ হিসেবে কলাতিয়া খাল উদ্ধারের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু কলাতিয়া বাজার ও সেতুর নিচে খালের যে করুন অবস্থা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তাতে এই খননকাজ আদৌ কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয় জনগণের মনে বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়েছে। খালের প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকা ইতিমধ্যেই ময়লা-আবর্জনার একটি বিশাল ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে এবং মানুষ এখন খালের ওপর দিয়ে হেঁটে চলাচল করতে বাধ্য হচ্ছে। এই দৃশ্য কেবল পরিবেশগত বিপর্যই নির্দেশ করে না, বরং সরকারি অর্থের মারাত্মক অপচয়কেও সামনে নিয়ে আসে।
শিক্ষার্থীদের উপর মারাত্মক প্রভাব: শ্রেণিকক্ষে দুর্গন্ধের যন্ত্রণা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্রটি ধরা পড়েছে সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে অবস্থিত খালের অংশে। এখানে ময়লার তীব্র দুর্গন্ধের কারণে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেণিকক্ষে বসে পড়াশোনা করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি এতটাই সংকটপূর্ণ যে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে একটি শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। পাঁচ বছরের একটি শিশু যখন বলে ‘গন্ধে মাথা ঘোরায়’, তখন সমাজ কিংবা প্রশাসন—কেউই এই দায়ভার থেকে মুক্ত হতে পারে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়াল ঘেঁষে খালের জায়গায় অবৈধ দখল ও ভরাট কেবল একটি পরিবেশগত অপরাধই নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যের উপর এক অপূরণীয় আঘাত হিসেবে কাজ করছে।
ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের ভূমিকা: সচেতনতা ও আইন প্রয়োগের অভাব
স্থানীয় বাজার বণিক সমিতি এই সমস্যা নিয়ে ‘সতর্ক করার’ দাবি জানালেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীদেরই সবার আগে সচেতন হওয়া জরুরি, কারণ তারাই অনেকাংশে এই দূষণের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। তবে তাদের সচেতন করতে এবং আইন মানতে বাধ্য করতে স্থানীয় প্রশাসনেরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র খনন করে খালের গভীরতা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না; একইসাথে ময়লা ফেলা এবং অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ করণীয়
কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এই বিষয়টি ‘খতিয়ে দেখার’ আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা আশা করি, এই আশ্বাস যেন কেবল আমলাতান্ত্রিক কথার কথা হয়ে না থাকে। কলাতিয়া খালকে বাঁচাতে হলে খননকাজের পাশাপাশি নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো জরুরিভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে:
- বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা: খালের আশেপাশে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন এবং নিয়মিত সংগ্রহ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
- দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: ময়লা ফেলা এবং অবৈধ দখলের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
- সমন্বিত প্রচেষ্টা: স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে।
খননযন্ত্রের শব্দে পরিবেশ রক্ষা হবে না; খালের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে হলে টেকসই সমাধান প্রয়োজন। যদি খননকাজের পরেও কোনো সুফল না পাওয়া যায়, তাহলে জনগণের করের অর্থ এইভাবে অপচয় করার কোনো যৌক্তিকতা থাকে না।



