বাংলাদেশের নদী-খাল পুনরুদ্ধার: পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য কৌশলগত বিনিয়োগ
বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে ৫২০টিরও বেশি নদী হারিয়ে গেছে এবং প্রায় ৬০ শতাংশ খাল ও ছোট নদী ভরাট, দখল বা পলিতে বন্ধ হয়ে গেছে। হবিগঞ্জের করাঙ্গী নদী তার একটি উদাহরণ, যা এখন পানি শুকিয়ে ‘মরা খালে’ পরিণত হয়েছে। এই সংকোচন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ সেচের ওপর নির্ভরশীল, এবং মৎস্য খাত জিডিপির প্রায় ৩.৫ শতাংশ অবদান রাখে। নদী-খালের নেটওয়ার্ক ভেঙে যাওয়ায় সেচ সংকট, জলাবদ্ধতা ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতি দেখা দিয়েছে। রাজশাহী, নাটোরসহ বহু অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, এবং ঢাকা-চট্টগ্রামে খাল ভরাটের কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
২০ হাজার কিলোমিটার পুনঃখনন কর্মসূচি
এই বাস্তবতায় সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল পুনঃখননের একটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ পর্যন্ত পাইলট প্রকল্প শুরু হতে যাচ্ছে, এবং ১৮০ দিনের মধ্যে প্রথম ১ হাজার কিলোমিটারের অগ্রগতির পরিকল্পনা চলছে। এর সঙ্গে সমন্বিত ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও চালু।
সাফল্যের স্তম্ভ ও সম্ভাব্য সুবিধা
পরিকল্পনা, সমন্বয়, অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ—এই চারটি স্তম্ভের ওপর নির্ভর করছে কর্মসূচির সাফল্য। সফল বাস্তবায়ন হলে:
- প্রায় ২০ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা বাড়বে।
- ৩ কোটির বেশি মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে।
- উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা রোধ হবে।
- গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক মডেল ও প্রযুক্তির ব্যবহার
নেদারল্যান্ডসের ‘রুম ফর দ্য রিভার’ এবং ভারতের জলশক্তি অভিযানের মতো আন্তর্জাতিক মডেল থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। জিআইএস ও স্যাটেলাইট ইমেজ ব্যবহার করে খালের ঐতিহাসিক গতিপথ চিহ্নিত করা জরুরি, যা দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করবে।
পলি ব্যবস্থাপনা ও নীতি উদ্যোগ
খনন করা পলি কৃষিজমির উর্বরতা বাড়ানো, অবকাঠামো নির্মাণ ও ইকো-বাফার দ্বীপ তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। সরকারের ‘ড্রেজিং ও ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা, ২০২৫’ এই দিকে গুরুত্ব দিয়েছে। সমন্বিত কর্তৃপক্ষ গঠন, জনঅংশগ্রহণ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ নীতি জরুরি।
উপসংহার
২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল পুনরুদ্ধার শুধু পরিবেশ প্রকল্প নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মসূচি। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, পানি ব্যবস্থাপনায় প্রতি ১ টাকা বিনিয়োগে ৪-৫ টাকা অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব। এই উদ্যোগ ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।



