খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে পাহাড় কাটার অব্যাহত উৎসব
খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলায় একের পর এক সবুজ পাহাড় বিলীন হয়ে যাচ্ছে মাটিখেকোদের স্কেভেটরের থাবায়। স্থানীয় প্রশাসন বারবার অভিযান চালিয়ে মামলা দায়ের ও জরিমানা করেও এই অবৈধ কার্যক্রম রোধ করতে পারছে না। এলাকাবাসীর দাবি, গত তিন মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে আটটি পাহাড় সম্পূর্ণরূপে কেটে সাবাড় করে দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিনের অসাধু চক্রের কারসাজি
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এক শ্রেণির অসাধু ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি খাস কিংবা বন্দোবস্তপ্রাপ্ত পাহাড়-টিলা ভূমির মাটি অবৈধভাবে কেটে বিক্রি করছেন। এই মাটি প্রধানত নতুন বসতবাড়ি নির্মাণ ও নিচু ভূমি ভরাটের কাজে ব্যবহৃত হয়। আগে পাহাড় কাটার জন্য কোদাল বা শাবলের মতো সরঞ্জাম ব্যবহার করা হলেও বর্তমানে মাটিখেকোরা স্কেভেটর ও পেলুডারের মতো শক্তিশালী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে দ্রুতগতিতে পাহাড় ধ্বংস করছে।
পরিসংখ্যানে ভয়াবহ চিত্র
গত এক বছরে মানিকছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৫০টি ছোট, মাঝারি ও বড় আকারের পাহাড়-টিলা কেটে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করা হয়েছে। চলতি বছরের গত তিন মাসেই এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আটটিতে। সদর ইউনিয়নের লেমুয়ায় একটি, বড়ডলুতে একটি ও এয়াতলংপাড়ায় দুটি পাহাড় কাটার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়া যোগ্যাছোলা ইউনিয়নের খাড়িছড়া ও কালাপানিতে চারটি পাহাড় কেটে ফেলা হয়েছে।
প্রশাসনের ব্যর্থ অভিযান
উপজেলা প্রশাসন পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে অর্থদণ্ড ও পরিবেশ আইনে একাধিকবার মামলা দায়ের করেছে। তবে এসব পদক্ষেপও মাটিখেকোদের দমাতে পারেনি। সর্বশেষ গত রবিবার উপজেলা প্রশাসন একটি মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে পাহাড় কাটায় নিয়োজিত দুটি স্কেভেটর জব্দ করতে সক্ষম হয়।
জানা গেছে, সম্প্রতি উপজেলার কালাপানি মৌজার যোগ্যছোলা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খাড়িছড়া মাস্টারপাড়া নামক প্রত্যন্ত এলাকায় ১৫ একরের সরকারি খাস ভূমির চারটি পাহাড় কেটে লেক ও রাস্তা তৈরির কাজ শুরু করে জনৈক ব্যক্তি। গোপনে রাতের আঁধারে নির্জন ঐ এলাকায় গত তিন-চার দিন ধরে দুটি শক্তিশালী স্কেভেটরের সাহায্যে পাহাড় কাটার কাজ অব্যাহত ছিল।
অভিযানের বিস্তারিত
গত রবিবার গোপনসূত্রে খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন মোবাইল কোর্টের অভিযান চালায় ঐ স্থানে। কিন্তু মোবাইল কোর্ট পৌঁছানোর আগেই মাটিখেকোরা দুটি স্কেভেটর ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। পরে স্কেভেটর দুটি জব্দ করা হয়। সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহিরার নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।
সহকারী কমিশনার খাদিজা তাহিরা জানান, অভিযানের খবর পেয়ে জড়িতরা দ্রুত পালিয়ে যায়। জব্দ করা একটি স্কেভেটর গতকাল সোমবার থানা হেফাজতে এনে রাখা হয়েছে। আরেকটি নিয়ে আসার প্রস্তুতি চলছে। তিনি বলেন, ‘ঐ পাহাড়গুলো সরকারি খাস খতিয়ানের। মো. মনির হোসেন নামে জনৈক ব্যক্তি পাহাড়গুলো কাটার সঙ্গে জড়িত বলে জানতে পেরেছি। পাহাড় কাটায় জড়িত ব্যক্তিদের নামে পরিবেশ আইনে মামলা দায়েরের জন্য খাগড়াছড়ি পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালককে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি দুই-এক দিনের মধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মামলা করবেন।’
সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান
তিনি আরো উল্লেখ করেন, ‘পাহাড়, মাটি, বালু রক্ষায় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন ব্যক্তিবর্গ এগিয়ে না এলে শুধু প্রশাসনের একার পক্ষে এসব রোখা যাবে না।’ এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, পরিবেশ ধ্বংসের এই প্রবণতা রোধ করতে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।



