হাকালুকি হাওরে বিরল মেটে রাজহাঁসের আবির্ভাব, পাখিশুমারিতে নতুন রেকর্ড
হাকালুকি হাওরের চেনাউড়া বিলে এক ঝাঁক মেটে রাজহাঁসের সঙ্গে অন্যান্য পরিযায়ী পাখির বিচরণ দেখা গেছে। ৫ ফেব্রুয়ারি ভোরে কুলাউড়া শহরের সিআরপি রেস্টহাউস থেকে রওনা হয়ে হাওরের দিকে যাত্রা শুরু করা হয়। এই হাওরের প্রায় সব কটি বিলই পরিচিত, যেগুলোর নাম অদ্ভুত সুন্দর। হাওয়াবন্যা, কালাপানি, দুধাই, চোকিয়া, উজান-তরুল, লরিবাঈ, তল্লার বিল, চেনাউড়া, পিংলা, চেল্লা, নাগাঁও-ধুলিয়া, মালাম, ফুয়ালা, পলোভাঙ্গা, হাওর খাল, কইর-কণা, কুকুরডুবি, বালিজুড়ি, কাটুয়া বিলের নাম শুনলে চোখে ভেসে ওঠে শীতের জলচর পাখির বিচরণের দৃশ্য।
চেনাউড়া বিলে বিরল দৃশ্য
প্রায় এক ঘণ্টা পর চেনাউড়া বিলের মুখে পৌঁছানো হয়। চারদিক সবুজে ভরা, কচি ইরি ধানে হাওরের অনেক জায়গা পূর্ণ। মাঝেমধ্যে জলজ ঘাসবন দেখা যায়। সকালের রোদের আলোয় টেলিস্কোপে প্রায় ৫০০ খয়রা কাস্তেচরা পাখির এক বড় দল দেখা যায়। বিশাল চেনাউড়া বিলজুড়ে পাখি আর পাখি। এক ঝাঁক খয়রা চখাচখির সঙ্গে প্রথমেই তিনটি মেটে রাজহাঁস দেখে চমকে উঠতে হয়। এই বিলে পাখিটির দেখা সত্যিই বিরল ঘটনা। সুইডিশ পাখি দেখিয়ে বন্ধু জ্যান-এরিক নিলসেন তাঁর টেলিস্কোপে চোখ লাগিয়ে বলেন, ১৯৪টি মেটে রাজহাঁস আছে। এতগুলো হাঁস একসঙ্গে পাওয়া যায়নি আগে। তিনি আরও একটি হাঁসের দেখা পান, নাম তার বড় ধলাকপাল রাজহাঁস, যা হাকালুকিতে আগে দেখা মেলেনি। এই একটি বিলেই ২১ প্রজাতির প্রায় ৬ হাজার পাখির দেখা পাওয়া যায়।
দুই দশকের পাখিশুমারি
দুই দশক ধরে হাকালুকি হাওরে পাখিশুমারিতে অংশ নেওয়া হচ্ছে। চেনাউড়া বিলে এর আগেও বহুবার যাওয়া হয়েছে, কিন্তু এত ভালো পাখি কখনো পাওয়া যায়নি। চেনাউড়া বিলের পর পিংলা বিলে পাখি গণনা করা হয়। এই বিলেও ১২ প্রজাতির প্রায় ৫ হাজার পাখির দেখা পাওয়া যায়, তবে বেশির ভাগই ছিল শামুকখোল, যা দেশি জলচর পাখি। ইদানীং হাওর এলাকায় এই পাখির সংখ্যা বেড়ে চলছে।
হাওরজুড়ে জরিপের ফলাফল
হাকালুকি হাওরজুড়ে দুই দিনে প্রায় ৪৩টি বিলে পাখি জরিপ করা হয়। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্যরা মূলত জরিপের কাজটি করেছেন এবং সহযোগিতা করেছেন নবপল্লব প্রকল্পের কর্মীরা। দুটি দলে ভাগ হয়ে প্রতিদিন ১০-১২টি করে বিলের শুমারি করে একটি দল। একটি দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন ইনাম আল হক, আর অন্য দলটিতে পাঁচজন সদস্য ছিলেন।
হাওর খাল বিলে পাখি দেখার সেরা মুহূর্ত ছিল, যা হাকালুকির সবচেয়ে বড় বিল। প্রায় ২০ হাজার পাখির দেখা পাওয়া যায় এই বিলে। যেদিকে চোখ যায়, শুধু পাখি আর পাখি। বেশির ভাগই শামুকখোল, পানকৌড়ি আর বক পরিবারের সদস্য। বিরল সৈকত পাখি কালালেজ জৌরালি ছিল প্রায় তিন হাজার। এত সংখ্যায় এই পাখির দেখা বাংলাদেশের খুব কম জায়গায় পাওয়া যায়। উত্তুরে টিটি নামের আরেকটি সৈকত পাখিরও দেখা এই বিলে পাওয়া যায়।
পরিযায়ী হাঁসের প্রাচুর্য
জলচর পাখিশুমারিতে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পরিযায়ী হাঁস। এ বছর পরিযায়ী হাঁস পাখি দেখা গেছে প্রায় ১৮টি প্রজাতির। সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে উত্তুরে ল্যাঞ্জাহাঁস, যার সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে চার হাজার। অন্যান্য হাঁসের মধ্যে ছিল লালমাথা ভূতিহাস, মরচেরং ভূতিহাঁস, পিয়ং হাঁস, উত্তুরে খুন্তেহাঁস, টিকি হাঁস। দুই প্রজাতির দেশি বুনো হাঁসও পাওয়া যায়, যার মধ্যে দেশি মেটে হাঁস পাওয়া যায় মাত্র এক জোড়া, আর বালিহাঁস পাওয়া যায় প্রায় ১০৯টি।
পাখির সংখ্যা বৃদ্ধি
হাকালুকি হাওরে এ বছর ৫৩ প্রজাতির প্রায় ৫৪ হাজার জলচর পাখি দেখা গেছে। এর মধ্যে পরিযায়ী জলচর পাখি প্রজাতি ছিল ৩৫টি, আর দেশি জলচর পাখি প্রজাতি ছিল ১৮টি। গত বছর এই হাওরে পাখি দেখা গিয়েছিল মাত্র ৩৭ হাজার, যা গত বছরের তুলনায় এ বছর পাখির সংখ্যা হাকালুকিতে কিছুটা বেড়েছে।
সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
হাকালুকিতে এ বছর যত পাখি দেখা গেছে, তার চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি পাখির আবাসস্থল টিকে আছে। পাখিশিকারির অত্যাচারে এই হাওরে পাখি কমেছে। হাওরে বেড়েছে হাঁসের খামার আর গোচারণ ভূমি। হাকালুকি হাওরে বিলের সংখ্যা প্রায় ২৭৬, যার বেশির ভাগ সরকারিভাবে লিজ দেওয়া হয় মূলত মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে। এ বছর যেসব বিলে পাখি গণনা করে যে সংখ্যায় পাখি পাওয়া গেছে, তার ৯৫ শতাংশ পাখি দেখা গেছে মাত্র পাঁচটি বিলে। হাকালুকির বিলগুলোর মধ্যে ১০-১৫টি বিল পাখির জন্য সংরক্ষণ কঠিন কিছু নয়। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে হাওরে পাখি ও মাছ—সবই বাড়বে।



