হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে উল্লুকের সন্ধান: বিরল প্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষায় চ্যালেঞ্জ
হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান থেকে সম্প্রতি উল্লুকের ছবি তোলা হয়েছে। তরুণ গবেষকদের একটি দল ভোরের কুয়াশাভেজা বুনো পথে সন্তর্পণে এগোচ্ছিলেন। বন তখনো গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। হঠাৎ উচ্চস্বরে হোও-ওক, হোও-ওক কিংবা হোলোক-হোউ, হোউ-হোলোক ডাক নিস্তব্ধ বনকে চিরে দিয়ে গেল। এমন শব্দ জীবনে প্রথম শুনে তারা কিছুটা ভড়কে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই যোগ দিল আরেকজন। দুজনের চড়া ডুয়েট ডাকে বন যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠল।
উল্লুক: প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি
আজ থেকে প্রায় দুই যুগ আগে শীতের এক ভোরে শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া পাহাড়ি বনে প্রথম উল্লুক দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন গবেষকরা। ইংরেজি নাম ওয়েস্টার্ন হোলোক গিবন। লাতিন ভাষায় হোলোক হোলোক। বিজ্ঞানীদের কাছে এরা স্মল এইপ নামেও পরিচিত।
উল্লুক শব্দটি অনেকের কাছেই অপরিচিত নয়। গ্রামীণ সমাজে মৃদু তিরস্কার বা গালি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু বাস্তবে উল্লুকের মতো সুদর্শন, স্মার্ট ও ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন প্রাণী খুব কমই আছে। কিছুটা বানরের মতো দেখতে হলেও উল্লুক বানর গোত্রীয় নয়। এরা নর-বানর। আকৃতি, গঠন, বুদ্ধিমত্তা কিংবা সামাজিক আচরণে এরা মানুষের খুব কাছাকাছি।
উল্লুকের বৈশিষ্ট্য:
- একমাত্র প্রাণী যার লেজ নেই
- বনমানুষ নামেও পরিচিত
- বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ি বনে টিকে আছে
- ভারতের আসাম, মিজোরাম ও মিয়ানমারের কিছু বনেও দেখা যায়
- আইইউসিএনের লালতালিকায় বিপন্ন প্রাণী
সৌন্দর্য ও পারিবারিক জীবন
উল্লুক দেখতে অত্যন্ত সুদর্শন। পুরুষ উল্লুক উজ্জ্বল কালো বর্ণের। গভীর বাদামি চোখের ওপর ধবধবে সাদা আইভ্রু মুখমণ্ডলে দৃষ্টিনন্দন অবয়ব সৃষ্টি করেছে। স্ত্রী উল্লুকের দেহ হালকা বাদামি থেকে হলুদাভ বা সোনালি। চোখের চারপাশ ও মুখের অগ্রভাগ ঘিরে সাদা পাউডারের মতো বলয় প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি।
উল্লুকের পারিবারিক জীবন প্রাণিজগতের এক বিস্ময়। পুরুষ ও স্ত্রী উল্লুকের জীবনে নিবিড় বন্ধন দেখা যায়। তারা ছোট দলে বসবাস করে। একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী উল্লুক প্রাপ্ত বয়সে জোড় বেঁধে পরিবার গঠন করে। জীবনের নানা ঝড়ঝাপ্টা এলেও তারা একজন আরেকজনকে ত্যাগ করে না। এই সম্পর্ক অটুট থাকে সারা জীবন।
পারিবারিক কাঠামো:
- একটি দলে একাধিক পূর্ণ বয়সী পুরুষ বা স্ত্রী উল্লুক থাকে না
- সন্তান পূর্ণ বয়সে উপনীত হলে নতুন সংসার গড়ে তোলে
- বাবা-মায়ের পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলে নিজেদের টেরিটরি স্থাপন করে
- এটি মানববসতি স্থাপনের বুনো সংস্করণের মতো
জীবনকাল ও খাদ্যাভ্যাস
উল্লুক মাত্র ২৫ বছর বাঁচতে পারে। পূর্ণ বয়সী উল্লুক আড়াই ফুটের মতো লম্বা হয় আর ওজন হতে পারে প্রায় সাত কেজি। স্ত্রী কিছুটা ছোট হয়। দেহের তুলনায় উল্লুকের হাত-পা বেশ লম্বা। এই লম্বা হাত, লম্বা হুকের মতো আঙুল এবং কাঁধের নমনীয় অস্থিসন্ধি ব্যবহার করে গাছের এক ডাল থেকে অন্য ডালে দ্রুতগতিতে চলাচল করতে পারে। এদের চলার গতি ঘণ্টায় ৫৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
উল্লুকের প্রধান আহার বুনো ফল। চাপালিশ, ডুমুর, কাউফল, বট-পাকুড়, খুদি জাম ইত্যাদি পছন্দ করে। শীতকালে বনে ফলের পরিমাণ কমে এলে গাছের কচি পাতা, ফুল, কুঁড়ি, বাকল কিংবা পোকামাকড় খেয়ে থাকে। ফল খাওয়ার মাধ্যমে গাছের বীজ বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে ছড়িয়ে দেয় এই উল্লুকেরা। বন সৃষ্টি, বনের সম্প্রসারণ ও বুনো বীজের অঙ্কুরোদগমে উল্লুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জ
নিবিড় বন উল্লুকের প্রধান আবাস। খণ্ডিত বনে কিংবা ঘন প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ছাড়া এরা টিকে থাকতে পারে না। নব্বইয়ের দশকে চট্টগ্রামের চুনতির বন ছিল উল্লুকের অন্যতম একটি আবাসস্থল। কিন্তু বনের ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় কমিউনিটিকে আস্থায় না নিয়ে চুনতির বনকে বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হলে কয়েক বছরের মধ্যেই বনের গাছপালা উজাড় হয়। সেই সঙ্গে চিরতরে হারিয়ে যায় বাংলাদেশের উল্লুকের একটি বড় পপুলেশন।
বনাঞ্চল টিকিয়ে না রাখতে পারলে দেশের একমাত্র বিরল এই স্মল এইপের বিলুপ্তি অনিবার্য। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে উল্লুকের উপস্থিতি আশার আলো দেখালেও বন সংরক্ষণ ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ছাড়া এই বিরল প্রাণী রক্ষা করা সম্ভব নয়।
এম এ আজিজ, অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



