মেট্রোরেলের কারণে ঢাকায় তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস: গবেষণা
মেট্রোরেলের কারণে ঢাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি: গবেষণা

মেট্রোরেলের কারণে ঢাকায় তাপমাত্রা বেড়েছে ৩ থেকে ৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস: গবেষণা

ঢাকার উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলপথ যাত্রীদের চলাচলে স্বস্তি এনেছে, কিন্তু এটি পরিবেশে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একটি সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে, এই রেলপথ ও এর আশেপাশের এলাকায় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গবেষকরা এটিকে ‘স্থানিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা নগর উন্নয়নের প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।

গবেষণার মূল ফলাফল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ, ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ৯ বছরে উত্তরের দিয়াবাড়ি থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার রেলপথে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৩ থেকে ৫.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে। এই বৃদ্ধি রেললাইনের উভয় পাশে ৫০০ মিটার ব্যাসার্ধে ছড়িয়ে পড়েছে। গবেষণাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুদানে পরিচালিত হয়েছে এবং ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর এনভায়রনমেন্টাল চ্যালেঞ্জেস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ

গবেষণায় তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে:

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
  • গাছপালা অপসারণ: মেট্রোরেল নির্মাণের সময় প্রচুর গাছ কাটা পড়ায় সূর্যের আলো সরাসরি সড়কে পড়ছে, যা তাপ শোষণ বাড়াচ্ছে।
  • কংক্রিট স্থাপনা: মেট্রোরেলের ভায়াডাক্ট ও স্টেশনগুলো কংক্রিটের তৈরি, যা দিনে তাপ শোষণ করে রাতে ছাড়ে, ফলে এলাকাগুলো উত্তপ্ত থাকে।
  • বায়ু চলাচলে বাধা: উঁচু অবকাঠামোর কারণে বাতাসের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তাপ আটকা পড়ে যাচ্ছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মো. মহিন উদ্দিনের মতে, এই লাইন একটি ‘তাপ করিডর’ হিসেবে কাজ করছে, বিশেষ করে উত্তরা, মিরপুর, ফার্মগেট ও মতিঝিল এলাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে।

গবেষকদের সুপারিশ

গবেষকরা মেট্রোরেলের তাপমাত্রা কমানোর জন্য বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন:

  1. মেট্রোরেলের পিলারগুলোর গা ঘেঁষে লতাজাতীয় গাছ লাগানো।
  2. স্টেশনের ছাদ ও লাইনের দুই পাশের ভবনগুলোর ছাদে ছাদবাগান তৈরি করা।
  3. খোলা জায়গার পরিমাণ বাড়ানো এবং সড়ক বিভাজকগুলোকে সবুজ আচ্ছাদনের আওতায় আনা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান বদরুদ্দোজা মিয়া উল্লেখ করেন, ‘একটি শহরে ২৫ শতাংশ সবুজ এলাকা থাকা উচিত, কিন্তু ঢাকায় এটি ১০ শতাংশের নিচে। তাই মেট্রোরেলের প্রভাব মোকাবিলায় সবুজায়ন জরুরি।’

গবেষণার তাৎপর্য

এই গবেষণা প্রথমবারের মতো প্রমাণ করে যে, মেট্রোরেলের মতো বড় অবকাঠামো কীভাবে স্থানিক তাপমাত্রা বাড়াতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘দ্রুত নগরায়ণের কারণে এ ধরনের প্রকল্প দরকার, কিন্তু পরিবেশগত প্রভাব কম মনোযোগ পায়। আমাদের একদিকে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে, অন্যদিকে এর প্রভাব মোকাবিলায় ব্যবস্থা নিতে হবে।’ গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ২০১৫ সালে করিডরজুড়ে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৭.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০২৩ সালে বেড়ে ৩৩.৩ ডিগ্রিতে দাঁড়িয়েছে, ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ৩৬ ডিগ্রি রেকর্ড করা হয়েছে।

মেট্রোরেলের নির্মাণে কত গাছ কাটা পড়েছে, সে তথ্য ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড বা বন বিভাগের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি, যা পরিবেশগত জবাবদিহিতার অভাব নির্দেশ করে। গবেষকরা সতর্ক করেছেন, ভবিষ্যতে অনুরূপ প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও প্রশমনের জন্য বাজেট বরাদ্দ রাখা উচিত, যাতে নগর উন্নয়ন টেকসই হয়।