দেশীয় গাছের পুনরুত্থান: ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণে নতুন দিশা
গত এক দশকে দেশে প্রায় সাড়ে ১১ কোটি গাছ কমেছে, অন্যদিকে বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতি যেমন আকাশমণি ও ইউক্যালিপটাসের বিস্তার ঘটেছে। এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যা আগামী জুন থেকে শুরু হবে। এই উদ্যোগে বিদেশি গাছের পরিবর্তে দ্রুতবর্ধনশীল দেশীয় প্রজাতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।
কর্মসূচির বিস্তারিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত গাছ
বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক আর এস এম মুনিরুল ইসলামের মতে, এই কর্মসূচিকে ছয়টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে: উপকূলীয় বনায়ন, বন পুনরুদ্ধার, নগর বনায়ন, কমিউনিটিভিত্তিক বনায়ন, বসতবাড়ি ও কৃষি বনায়ন এবং উৎপাদনমুখী বনায়ন। দেশীয় গাছের তালিকায় জারুল, মেহগনি, গামার, জীবন, কদম, আগর, বাঁশ, শিলকড়ই, জাম, মহুয়া, বহেরা, অর্জুন, নিম, হরীতকী, কাঁঠাল ও চালতা অন্তর্ভুক্ত। আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে এক লাখ নিমগাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে, উপকূলীয় এলাকায় ঝাউ এবং সুন্দরবন এলাকায় সুন্দরী, গেওয়া, বাইন ও গরানগাছ লাগানো হবে।
বিদেশি গাছের প্রভাব ও নিষেধাজ্ঞা
ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছ দ্রুত বাড়লেও এগুলো প্রচুর পানি শোষণ করে মাটিকে রুক্ষ করে তোলে এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। গত বছরের ১৫ মে অন্তর্বর্তী সরকার এই গাছগুলোর চারা তৈরি, রোপণ ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জাতীয়-আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে দেশি প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সতর্কতা
বন্য প্রাণী ও বনবিশেষজ্ঞ রেজা খান এই কর্মসূচিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, "দেশীয় প্রজাতির গাছ দিয়েই এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন করা দরকার, কারণ এর মূল উদ্দেশ্য পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।" তবে তিনি সতর্ক করেন যে, এক জায়গায় অতিরিক্ত গাছ রোপণ করলে পানির ওপর চাপ পড়তে পারে এবং কৃষিজমির পানির ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। তিনি মৃত্তিকাবিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও প্রাণিবিদদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের পরামর্শ দেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বর্তমান চাহিদা
বাংলাদেশে ১৯৩০ সালে সিলেটের চা–বাগানে প্রথম ইউক্যালিপটাস আনা হয়, যা পরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে দেশে বার্ষিক কাঠের চাহিদা ৮০ লাখ ঘনফুট, যার মধ্যে ৩০ লাখ ঘনফুট আমদানি করা হয়। নতুন কর্মসূচিতে উৎপাদনমুখী বনায়নে ১ কোটি ২৫ লাখ এবং কৃষি বনায়নে ২ কোটি ৫০ লাখ চারা রোপণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা দেশীয় গাছের মাধ্যমে কাঠের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখবে।



