চকরিয়ায় হারিয়ে যাওয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার তাগিদ
চকরিয়া উপজেলায় একসময় বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে থাকা প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। মাত্র একটি সুন্দরীগাছ টিকে থাকা এই বন পুনরুদ্ধারের উপায় নিয়ে গতকাল শনিবার চকরিয়া উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে প্রথম আলো আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছার ওপর জোর দিয়েছেন।
প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনাই প্রথম শর্ত
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন সভায় বলেন, ম্যানগ্রোভ বন কেবল গাছের সমষ্টি নয়; এটি একটি জটিল বাস্তুসংস্থান যা উপকূলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিন চিংড়ি চাষের কারণে চকরিয়া সুন্দরবনের মাটির গঠন ও লবণাক্ততার মাত্রা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, যা গাছ জন্মানোর পরিবেশ নষ্ট করেছে।
পুনর্বনায়নের প্রথম শর্ত হিসেবে অধ্যাপক আল আমীন প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ও জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, ধাপে ধাপে মাটির লবণাক্ততা কমানো, পলি জমার প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় প্রজাতির গাছ রোপণের পাশাপাশি এলাকাকে কয়েক বছর মানবীয় হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ম্যানগ্রোভের গুরুত্ব
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব তুলে ধরে অধ্যাপক আল আমীন বলেন, সরকার সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এই কর্মসূচিকে কার্যকর করতে হলে উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এতে বনভূমি বাড়ার পাশাপাশি লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং দুর্যোগের ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারে ‘উল্টো পথে যাত্রা’ প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ইজারার মাধ্যমে চিংড়ি চাষে ব্যবহৃত জমিগুলো ধীরে ধীরে বন ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনতে হবে, তবে এর আগে স্থানীয় মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।
ধ্বংসের ইতিহাস ও বর্তমান চ্যালেঞ্জ
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম সভায় বলেন, মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক ধরে রাখতে না পারার ফলেই বন হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ম্যানগ্রোভ বন শুধু দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে না, চিংড়ির উৎপাদন ও মানও বাড়ায়। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য বন উজাড় করায় দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশ ও অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে।
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘চকরিয়ার সুন্দরবনের ধ্বংস একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফল, যার সূত্রপাত অন্তত ১৯৭৭ সাল থেকে। তবে অতীতের দায় নির্ধারণের চেয়ে বর্তমান বাস্তবতা বোঝা ও সমাধানের পথ খোঁজাই এখন বেশি জরুরি।’ তিনি আরও বলেন, একটি বন বা প্রাকৃতিক অঞ্চল শুধু পরিবেশ নয়, মানুষের নিরাপত্তা ও জীবনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও উদ্বেগ
আলোচনা সভায় স্থানীয় বাসিন্দা, গবেষক ও পরিবেশকর্মীরা নানা প্রশ্ন ও মতামত তুলে ধরেন। বদরখালী এলাকার কৃষক শামস উদ্দিন জানতে চান, বনটি পুনরুদ্ধার হবে কীভাবে। তাঁর মতে, শুধু সুন্দরীগাছ লাগিয়ে বনের পুনর্জন্ম সম্ভব নয়; বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে সেগুলোর যত্ন নিতে হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া হতে হবে প্রাকৃতিক।
পেকুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ইয়াসমিন সুলতানা বলেন, চকরিয়ার এই বনাঞ্চলকে অনেকেই ‘ছোট সুন্দরবন’ নামে চেনেন। সঠিক উদ্যোগ নিলে এই বন আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এখন থেকে বাস্তব পদক্ষেপ কী হবে—আগামীকাল থেকেই কীভাবে কাজ শুরু করা যাবে।
এর উত্তরে মতিউর রহমান বলেন, সাংবাদিকতার মাধ্যমে বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তোলা হবে এবং এ নিয়ে আরও আলোচনা ও ধারাবাহিক প্রতিবেদন করা হবে।
বনের করুণ ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
প্রথম আলোর গত বছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এককালে চকরিয়া উপজেলায় প্রায় ২১ হাজার ১০২ একর আয়তনজুড়ে বিস্তৃত ছিল এই বন। কিন্তু গত কয়েক দশকের অবিবেচক উন্নয়ন ও লোভের বলি হয়ে আজ এটি এক লবণ মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ১৯৯৫ সালের মধ্যে বনের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় মাত্র ৮৬৬ একরে, যা বর্তমানে শূন্যের কোঠায়।
গবেষকেরা বলছেন, আজও চাইলে চকরিয়ার বন ফিরিয়ে আনা সম্ভব, তবে তা অত্যন্ত জটিল। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং চিংড়িঘেরের ইজারা বাতিল করে কয়েক বছর বনকে নিরুপদ্রব রাখা। আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সচেতনতা বাড়লে হারিয়ে যাওয়া এই প্রাকৃতিক সম্পদ আবারও ফিরে আসতে পারে।



