চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের তাগিদ
চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের জন্য বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে এই ম্যানগ্রোভ বন ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন। আজ শনিবার বিকেল ৪টায় কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে ‘হারিয়ে যাওয়া সুন্দরবন ফিরে পাওয়ার পথ কী’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ মতামত ব্যক্ত করেন। প্রথম আলো আয়োজিত এই সভায় স্থানীয় বাসিন্দা, গবেষক, পরিবেশকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার গুরুত্ব
অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ম্যানগ্রোভ বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি একটি জটিল বাস্তুসংস্থান যা উপকূলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা দেয় এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য নিরাপদ আবাস তৈরি করে। তিনি বলেন, লবণ চাষ নিয়ন্ত্রণ করে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ও জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ফিরিয়ে আনতে পারলে ধীরে ধীরে এই বনের পুনর্জন্ম সম্ভব। দীর্ঘদিন চিংড়ি চাষের কারণে চকরিয়া সুন্দরবনের মাটির গঠন ও লবণাক্ততার মাত্রা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, যা গাছ জন্মানোর পরিবেশ নষ্ট করেছে।
স্মৃতিচারণা করে অধ্যাপক আল আমীন বলেন, ‘ছাত্র অবস্থায় আশির দশকে এ বনে এসেছিলাম। আবার শিক্ষক হিসেবেও এসেছি। বনটি চোখের সামনেই হারিয়ে গেল।’ পুনর্বনায়নের প্রথম শর্ত হিসেবে তিনি প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ও জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন।
ধাপে ধাপে পুনরুদ্ধারের কৌশল
অধ্যাপক আল আমীনের মতে, পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
- ধাপে ধাপে মাটির লবণাক্ততা কমানো এবং পলি জমার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার করা।
- স্থানীয় প্রজাতির গাছ—সুন্দরী, গেওয়া ও গরান—রোপণের উদ্যোগ গ্রহণ করা।
- কয়েক বছর এলাকা মানবীয় হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা, যাতে প্রাকৃতিকভাবে চারা জন্মাতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব অপরিসীম। সরকার সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে; এই কর্মসূচিকে কার্যকর করতে হলে উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
চ্যালেঞ্জ ও সমাধানের পথ
চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারে ‘উল্টো পথে যাত্রা’ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক আল আমীন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ইজারার মাধ্যমে চিংড়ি চাষে ব্যবহৃত জমিগুলো ধীরে ধীরে বন ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনতে হবে, তবে এর আগে স্থানীয় মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। জীবিকার নিশ্চয়তা ছাড়া জমি ইজারামুক্ত করা বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে কত দ্রুত মাটির ভৌত ও জীববৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানির প্রভাবে মাটির ওপর শক্ত লবণের স্তর বা ‘সয়েল প্যান’ তৈরি হয়েছে; এই স্তর ভেঙে মাটিকে এমন অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে বীজ পড়লে অঙ্কুরোদ্গম হয় এবং অণুজীবের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হতে পারে।
সভায় অন্যান্য বক্তারা
আলোচনা সভায় অংশ নেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম, প্রথম আলোর উপসম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহসি, চকরিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ন দেব, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা, গবেষক সৈয়দ মঈনুল আনোয়ার প্রমুখ। সভায় বনের করুণ ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন শেষে বলেন, পুরো প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা থাকলেও পরিকল্পিত গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে চকরিয়ার হারিয়ে যাওয়া সুন্দরবনের অন্তত একটি অংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে।



