শেরপুরে গারো পাহাড়ের বনাঞ্চল রক্ষায় তরুণদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
শেরপুরের গারো পাহাড়-সংলগ্ন সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলকে আগুনের ঝুঁকি থেকে রক্ষায় ব্যতিক্রমধর্মী সচেতনতামূলক কর্মসূচি হাতে নিয়েছে স্থানীয় তরুণেরা। সম্প্রতি সীমান্তবর্তী মধুটিলা এলাকায় শুরু হওয়া এই উদ্যোগে ‘হাতির খবর ও সচেতনতা গ্রুপ’ নামে বন-সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতামূলক ব্যানার টাঙানো হয়েছে।
বনাঞ্চল রক্ষায় পরিবেশবাদী সংগঠনের অংশগ্রহণ
এই উদ্যোগে বিউটি অব ঝিনাইগাতী, প্রশাখা, আপন শিক্ষা পরিবার, এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিম, গ্রিন ইনিশিয়েটিভ সিংগাবরুনাসহ একাধিক পরিবেশবাদী সংগঠন অংশ নিয়েছে। সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে গারো পাহাড়ের বনভূমি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ঝরে পড়া শুকনো পাতা ও কমে যাওয়া মাটির আর্দ্রতায় বন অত্যন্ত দাহ্য হয়ে ওঠে।
এ অবস্থায় অসাবধানতা বা দুষ্কৃতকারীদের কারণে আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় জীববৈচিত্র্য, মাটির উর্বরতা, জলচক্র ও জলবায়ুর ভারসাম্য।
ঈদুল ফিতরের পর পর্যটক সমাগম মোকাবিলায় মানবিক বার্তা
ঈদুল ফিতরের পর বাড়তি পর্যটক সমাগম সামনে রেখে এই কর্মসূচির একটি মানবিক বার্তাও রয়েছে—প্রকৃতি উপভোগ করতে গিয়ে যেন কেউ বনের ক্ষতির কারণ না হন। সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নালিতাবাড়ীর পানিহাটা এলাকা থেকে শুরু করে ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদীর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় ব্যানার স্থাপন করা হয়েছে।
আয়োজকদের একজন রহমত আলী বলেন, ‘ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে অনেকে গারো পাহাড়ে ঘুরতে আসেন। কিন্তু এই আনন্দ যেন বনের প্রাণীদের দুর্ভোগের কারণ না হয়—সেই সচেতনতা তৈরিই আমাদের লক্ষ্য।’
বন বিভাগ ও পরিবেশ গবেষকদের মতামত
বিউটি অব ঝিনাইগাতী সংগঠনের সভাপতি পারভেজ মিয়া বলেন, ঈদের পর পাহাড়ি এলাকায় দর্শনার্থীর ভিড় বাড়ে। অনেকেই অসাবধানতাবশত সিগারেটের আগুন ফেলে দেন, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পুরো জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে।
বন বিভাগের এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের প্রতিনিধি আরফান আলী বলেন, ‘বনে আগুন লাগলে খাদ্যসংকটে পড়ে হাতিসহ বড় প্রাণীরা লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে মানুষ-হাতি সংঘাত বাড়ে, যা উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক।’
স্থানীয় বন্য প্রাণী প্রেমী কাঞ্চন মারাক বলেন, ‘আমাদের বন আমাদেরই রক্ষা করতে হবে—এই দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা কাজ করছি। আগুন থেকে পাহাড় ও বন্য প্রাণী রক্ষায় সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।’
পরিবেশ গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজের প্রতিনিধি শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘বনে আগুন পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর আঘাত হানে। মাটির অণুজীব থেকে শুরু করে বড় স্তন্যপায়ী প্রাণী—সবাই এর শিকার হয়। এই ভারসাম্য নষ্ট হলে তার প্রভাব মানুষের জীবনেও পড়ে।’
বন বিভাগের স্বাগত ও সমর্থন
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের এ উদ্যোগে স্বাগত জানিয়ে বন বিভাগের শ্রীবরদী উপজেলার বলিঝুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সুমন মিয়া বলেন, পাহাড়ি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এটা চমৎকার একটি উদ্যোগ। প্রতিবছর পাহাড়ে আগুন প্রতিরোধে বন বিভাগ থেকে সচেতনতা সৃষ্টিতে নানা কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে। তরুণদের এ উদ্যোগ পাহাড় রক্ষায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এই উদ্যোগটি শেরপুরের গারো পাহাড় অঞ্চলের বনাঞ্চল রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা স্থানীয় সম্প্রদায় ও পরিবেশবাদী গোষ্ঠীর সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আগামী দিনে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।



