হাওরে পানির কষ্ট: রমিলা বেগমের দিনে তিন বেলা পানি আনতে হয়, নলকূপে পানি উঠছে না
হাওরে পানির কষ্ট: রমিলা বেগমের দিনে তিন বেলা পানি আনতে হয়

হাওরে পানির কষ্ট: রমিলা বেগমের দিনে তিন বেলা পানি আনতে হয়

হাওরের ডোবা থেকে জলভরা একটি কলসি কাঁখে আর হাতে আরেকটি জগ নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রমিলা বেগম (৫১) বলছিলেন, ‘ঘরে নয়জন মানুষ। পুরুষ মানুষ ত ডোবায়-ডাবায় গিয়া গোসল করতা পারইন। ঘরের বেইট্টাইন্তর সমস্যা বেশি। তারার গোসল ও অন্য কাজের লাগি হাওরের ডোবা থাকি তিন বেলা পানি আনতে অয়। খানির পানির লাগি যাইতে অয় মাইনষের বাড়ি বাড়ি।’

গ্রামের অবস্থা ও পরিবারের কথা

রমিলা বেগমের বাড়ি সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের পারে, সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের লালপুর গ্রামে। গ্রামের পূর্বে বিস্তীর্ণ দেখার হাওর, এখন যা সবুজ ধানের সমারোহে ভরা। তাঁর ঘরের উত্তরে কিছু দূরে হাওরপারে আরেক বাড়ির একটি ডোবা আছে, সেখান থেকেই প্রতিদিন পানি আনতে হয় তাঁকে।

আলাপকালে রমিলা জানালেন, তাঁর স্বামী জফর আলী বয়স্ক মানুষ এবং কোনো কাজ করেন না। দুই ছেলে ফখরুল ইসলাম (২২) ও শেখরুল ইসলাম (২০) শ্রমিকের কাজ করেন। ছোট আরও এক ছেলে ও এক মেয়ে আছে। দুই ছেলেকে বিয়ে করিয়েছেন। অনেক কষ্টে টাকাপয়সা জোগাড় করে বছর চার আগে বাড়িতে একটি নলকূপ (হাতে চাপা) স্থাপন করেছিলেন, কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই সেটিতে আর পানি উঠছে না। বাড়িতে গভীর নলকূপ বসাবেন, সেই সামর্থ্যও নেই।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নারীদের জন্য পানির চ্যালেঞ্জ

বর্ষায় গোসলসহ দৈনন্দিন কাজে হাওরের পানি ব্যবহার করেন তাঁরা। শুকনা মৌসুমে হাওরে পানি থাকে না, যা সমস্যা বাড়িয়ে তোলে। এখন ঘরের পুরুষেরা হাওরের ওই ডোবাতেই গোসল সারেন, কিন্তু নারীদের ডোবায় গিয়ে গোসল করা সম্ভব নয়। তাই সেখান থেকে পানি আনতে হয়। শুধু নারীদের গোসল নয়, ঘরের দৈনন্দিন অন্যান্য প্রয়োজনে যে পানি লাগে, তা-ও ওই ডোবার পানিই ভরসা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

খাওয়ার পানির ব্যবস্থা কীভাবে হয়? রমিলা বেগম বলছিলেন, গ্রামে যাদের বাড়িতে হাতে চাপা নলকূপ আছে, সবারই একই অবস্থা—পানি ওঠে না। যাদের বাড়িতে গভীর নলকূপ আছে, তাদের বাড়ি থেকে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয়। রমিলা বেগম আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘বয়স অইছে। নিজেই কষ্ট করি তিন বেলা পানি আনি। ঘরের বউরে তো আর হাওরো পানির লাগি পাঠাইতাম পারি না। মাইনষে কিতা কইব।’

গ্রামের অন্যান্য বাসিন্দাদের অবস্থা

রমিলা বেগমের মেজ ছেলে শেখরুল ইসলাম মায়ের কথার ফাঁকে বলেন, ‘পানির মাঝে থাকি, আবার পানির লাগি কষ্ট করি। গ্রামের অনেকেরই এই অবস্থা।’ এটি সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলের একটি সাধারণ সমস্যা, যেখানে পানির প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও সুপেয় পানির অভাব দেখা দেয়।

এই পরিস্থিতি বিশ্ব পানি দিবসের আলোকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যা পানির টেকসই ব্যবস্থাপনার দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, যাতে গ্রামীণ নারী ও পরিবারগুলো পানির কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে পারে।