খুলনার কয়রা উপজেলায় তীব্র সুপেয় পানির সংকট, দুই লাখ মানুষ হাঁসফাঁস
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের জনপদ খুলনার কয়রা উপজেলা আজ সুপেয় পানির তীব্র সংকটে হাঁসফাঁস করছে। লবণাক্ত নদী, ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতচিহ্ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘ ছায়ায় এই এলাকার প্রায় দুই লাখ মানুষ প্রতিদিন খাবার পানির জন্য সংগ্রাম করছেন। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে পাঁচটিতে কার্যকর সুপেয় পানির কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই, বাকি দুই ইউনিয়নেও রয়েছে মারাত্মক ঘাটতি।
স্থানীয়দের কষ্টের গল্প
কয়রা উপজেলার প্রত্যন্ত জনপদ ৬নং কয়রা গ্রামের উপজাতি নারী বাসন্তী মুন্ডা বলেন, 'সকালে ঘুম থেকে উঠেই ৪ কিলোমিটার দূরের একটি সরকারি পুকুর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। প্রতিদিন ২-৩ বার পানি আনতে গিয়ে দিনের অন্য কাজ করতে সমস্যা হয়।' শুধু বাসন্তী নয়, কয়রা উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকার বাসিন্দারা একই সমস্যার মুখোমুখি।
আমাদী ইউনিয়নের বামনডাঙ্গা গ্রামে একমাত্র মিঠা পানির টিউবওয়েল ঘিরে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। বামনডাঙ্গা, দশবাড়িয়া, খেওনা, খিরোল, বালিয়াডাঙ্গা ও পাটুরিয়া—এই ছয় গ্রামের শত শত পরিবার বিকাল হলেই কলস হাতে ভিড় করেন। একটি কলস পানি তুলতে সময় লাগে পাঁচ থেকে দশ মিনিট। গরমের সময় পানির স্তর নেমে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেকে খালি হাতে ফেরেন।
পানির উৎসের সংকট
নদীবেষ্টিত এই জনপদের চারিদিকে পানির সমাহার থাকলেও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। শুকনো মৌসুম এলেই খাবার পানির সংকট তীব্র হয়। পুকুরগুলো খাবার পানির একমাত্র অবলম্বন থাকলেও অনেক পুকুর শুকিয়ে যাওয়ায় মানুষদের দূরদূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কিছু অংশে গভীর নলকূপের পানি পান করলেও পানির আধার স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
সরেজমিনে ঘুরে জানা গেছে, উপজেলার আমাদী, বাগালি ও মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের কিছু অংশে পানির সংকট সবচেয়ে তীব্র। এসব ইউনিয়নে অধিকাংশ নলকূপ অকার্যকর; কোথাও নলকূপ নেই বললেই চলে। এ ছাড়া কয়রা সদর ও মহারাজপুর ইউনিয়নের অনেক এলাকাতেও একই চিত্র। কিছু জায়গায় ডিপ টিউবওয়েল থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লবণাক্ত পানি উঠছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
শিক্ষা ও অর্থনীতির উপর প্রভাব
২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, কয়রা উপজেলার মোট জনসংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজার ১০২ জন। এখানে ১৪১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৪টি কলেজ, ৩৮টি হাইস্কুল, ২টি কামিল মাদ্রাসা, ৪টি আলিম মাদ্রাসা ও ২১টি দাখিল মাদ্রাসা রয়েছে। কিন্তু এত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঝেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয়রা বলছেন, মিঠাপানির অভাবে গৃহপালিত পশু পালনও ছেড়ে দিচ্ছেন অনেকে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ৫নং কয়রা গ্রামের বাসিন্দা আ. হামিদ সরদার বলেন, 'আমাদের প্রতিদিন ভ্যানযোগে কয়রা সদর থেকে ড্রামের মাধ্যমে পানি আনতে হয়। প্রতি ড্রামে খরচ হয় ২০-২৫ টাকা। সেই পানি পান করে আমাদের বেঁচে থাকতে হয়।'
সমাধানের পথ
কয়রা উপজেলা পানি কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ মনিরুজ্জামান মনু বলেন, সুপেয় পানির সংকট নিরসনে পুকুর খনন করে পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার) স্থাপন টেকসই সমাধান হতে পারে। তবে শুধু স্থাপন করলেই হবে না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পলিমার ট্যাংকি বিতরণে কিছুটা লাঘব হতে পারে পানির সমস্যা থেকে।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী ইস্তিয়াক আহমেদ জানান, কয়রা উপজেলার অধিকাংশ জায়গায় সুপেয় পানির সংকট রয়েছে এবং ডিপ টিউবওয়েলেও লবণাক্ত পানি ওঠে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধাপে ডিপ টিউবওয়েল ও পানির ট্যাংক বিতরণ কার্যক্রম চলমান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এক-দুই বছরের মধ্যে পানি সংকট কিছুটা হলেও দূর হবে।
সচেতন মহলের দাবি
কয়রার সচেতন মহল দাবি করছেন, খণ্ডকালীন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন বৃহৎ আকারে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর খনন, পিএসএফ স্থাপন এবং কঠোর তদারকি। অন্যথায় বিশুদ্ধ পানির অভাব স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হবে এবং পশুপালনসহ স্থানীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কয়রার বিস্তীর্ণ জনপদে এখন সবচেয়ে বড় চাওয়া, একটু মিঠাপানি। উন্নয়ন পরিকল্পনার কাগজে নয়, বাস্তবের কলস ভরে সেই পানির নিশ্চয়তা চায় উপকূলের মানুষ।



