গাজীপুরের শ্রীপুরে ভাওয়াল বনে লাগা আগুন নেভাতে বনকর্মীদের তৎপরতা, সচেতনতায় মাইকিং
শ্রীপুরে ভাওয়াল বনে আগুন নেভাতে বনকর্মীদের তৎপরতা

গাজীপুরের শ্রীপুরে ভাওয়াল বনাঞ্চলে লাগা আগুন নেভাতে বনকর্মীদের তৎপরতা

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার ভাওয়াল বনাঞ্চলের বিভিন্ন অংশে লাগা আগুন নেভাতে বন বিভাগের কর্মীরা তৎপরতা শুরু করেছেন। পাশাপাশি, স্থানীয় লোকজনকে আগুন নেভানোর কাজে সম্পৃক্ত করতে এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে এবং লোকজনকে নিয়ে এলাকাভিত্তিক সচেতনতামূলক সভা আয়োজিত হচ্ছে। অগ্নিসংযোগকারীকে ধরতে বিশেষ পুরস্কার ঘোষণা করেছে বন বিভাগ, যা এই সংকট মোকাবিলায় একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও মাইকিং

সোমবার (১৬ মার্চ) শ্রীপুর ফরেস্ট রেঞ্জের অধীন রাথুরা এবং সিংড়াতলী, শিমলাপাড়া বিটের আওতাধীন এলাকায় বন বিভাগ সচেতনতামূলক সভা, বনে আগুন না দেওয়ার পরামর্শ এবং আগুন নেভানোর কাজে অংশগ্রহণ করার জন্য মাইকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে তারা বনের গুরুত্ব বুঝতে পারেন এবং আগুন প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারেন।

আগুনের বিস্তার ও ক্ষয়ক্ষতি

শ্রীপুর উপজেলার বিন্দুবাড়ি এলাকায় ভাওয়াল বনাঞ্চলের শালবনঘেঁষা ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথসংলগ্ন এলাকায় ১২ মার্চ দুপুরে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। বিন্দুবাড়ি এলাকার আরও অন্তত পাঁচটি স্থানে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। একই দিন কর্ণপুর, গোসিংগা, বরমী, খোঁজেখানিসহ আশপাশের আরও ৭ থেকে ১০টি স্থানে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। গত সপ্তাহে শ্রীপুরের সিমলাপাড়া, মাওনা, বারতোপা, শিরীষগুড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় বনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটে, যা বনাঞ্চলের জন্য একটি বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

বনকর্মীদের তৎপরতা ও চ্যালেঞ্জ

সোমবার দুপুর থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত শ্রীপুর উপজেলার কয়েকটি জায়গায় বনকর্মীদের বিভিন্ন পদ্ধতিতে আগুন নেভাতে দেখা গেছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল থেকে পাঁচটি বিটে মোট ১৫টি স্থানে আগুন নিভিয়েছেন তারা। এর মধ্যে আছে মাওনা, পাঁচলটিয়া, কর্ণপুর, বিন্দুবাড়ি, রাথুরা, গাজিয়ারণ ও পোষাইদ মৌজা এলাকা। এসব জায়গায় প্রায় ২০ বনকর্মী কাজ করেছেন, কিন্তু জনবলের স্বল্পতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

বন বিভাগের শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘সোমবার এবং মঙ্গলবার দুই দিন শ্রীপুর ফরেস্ট রেঞ্জের অধীন পাঁচটি বিটে বনের আগুন মোট ১৫টি স্থানে আগুন নিভিয়েছেন বনকর্মীরা।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, গণমাধ্যমে আগুনের খবর আসার পর মানুষ বিষয়টি ব্যাপকভাবে জেনেছেন, কিন্তু এসব আগুন নিয়ন্ত্রণে তারা আগে থেকেই কাজ করছেন।

স্থানীয় সম্পৃক্ততা ও বিশেষ পুরস্কার

শ্রীপুর ফরেস্ট রেঞ্জের শিমলাপাড়া বিট কর্মকর্তা কাজী আব্দুর রহমান বলেন, ‘শিমলাপাড়া বিটের আওতাধীন মাওনা, শ্রীপুর সদর বিটের আওতাধীন বিন্দুবাড়ি, গাজিয়ারন, কর্ণপুর ও সাতখামাইর বিটের আওতাধীন পোষাইদ এবং রাথুরা বন বিট মৌজা এলাকায় প্রায় ২০ বনকর্মী আগুন নেভানোর কাজ করেছেন। শুক্রবার জুমার নামাজের আগে লোকজনকে আগুন বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে ছোট ছোট সভা করে তাদের আগুন প্রতিরোধ ও বনের গুরুত্ব বোঝানো হচ্ছে। আগুন লাগানোর কোনও ঘটনা দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে যেন বন বিভাগকে খবর দিতে ও নিজেদের আগুন নেভাতে বলা হচ্ছে। অপরদিকে আগুন দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত কাউকে ধরিয়ে দিলে বিশেষ পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সুপারিশ

নদী ও প্রকৃতি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, ‘বনের আগুন নেভানো ও প্রচারণা অবশ্যই ভালো কাজ এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এ ধরনের কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে বনের আশপাশ এলাকার মানুষ নিয়ে সভা সেমিনার করতে করা দরকার। বন এলাকা ও বিভিন্ন পেশার মানুষকে নিয়ে কমিউনিটি সাপোর্ট গ্রুপ তৈরি করা হোক। এতে বনে আগুন দেওয়ার তথ্য সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাবে। প্রতি উপজেলায় একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর প্রয়োজন, যাতে মানুষ আগুন দেখা মাত্রই তথ্য দিতে পারে।’

বন বিভাগের শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. মোখলেসুর রহমান আরও জানান, আগুন থেকে বাঁচতে মূল ভূমিকা পালন করতে পারেন স্থানীয় লোকজন। তারা যতক্ষণ বনের গুরুত্ব না বুঝবেন, ততক্ষণ বনের এসব আগুন নিয়ন্ত্রণ প্রায় অসম্ভব। বনের আশপাশে থাকা বাসিন্দারা আগুন লাগার শুরুতে নিভিয়ে দিলে এবং মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতা সরিয়ে দিলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কমে যায়। এ ছাড়া ফায়ার লাইন তৈরির মাধ্যমেও আগুন ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করা যায়। বনের আশপাশের বাসিন্দাদের এসব কাজে আগ্রহ কম থাকায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য মাইকিংসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ হানে নেওয়া হয়েছে, যা একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের দিকে ইঙ্গিত করে।