ঈদেও সুন্দরবনে বনরক্ষীদের ছুটি নেই, পরিবার ছাড়াই পালন হয় উৎসব
সুন্দরবনে বনরক্ষীদের ঈদ: পরিবার ছাড়াই দায়িত্ব পালন

ঈদেও সুন্দরবনে বনরক্ষীদের ছুটি নেই, পরিবার ছাড়াই পালন হয় উৎসব

ঈদ মানেই পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি এবং নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার অপেক্ষা। কিন্তু এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দেশের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন রক্ষায় নিয়োজিত বন বিভাগের অসংখ্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী। ঈদের সময় চোরা শিকারি চক্রের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় তাদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ছুটির পরিবর্তে বনের নিরাপত্তায় নিবেদিত প্রাণ

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঈদের মৌসুমে বিশেষ করে হরিণসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণী শিকারের চেষ্টা চালায় চোরা শিকারিরা। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সুন্দরবনে কর্মরত সব কর্মকর্তা ও বনরক্ষীদের ছুটি বাতিল করে কর্মস্থলে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে তারা পরিবার থেকে দূরে নির্জন বনেই ঈদ পালন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

সাতক্ষীরা রেঞ্জের পশ্চিম সুন্দরবনের লাটাবেকি টহল ফাঁড়িতে কর্মরত বনরক্ষী আবদুল হাকিম প্রায় কয়েক মাস ধরেই গহিন বনে দায়িত্ব পালন করছেন। লোকালয় থেকে সেখানে পৌঁছাতে নৌকায় সাত থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগে। তিনি বলেন, ‘চাকুরির পাঁচ বছরে মাত্র একবার পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পেরেছি। বাকি সব ঈদ সুন্দরবনেই কাটাতে হয়েছে। মন খারাপ হয়, তবে দায়িত্বই বড়।’ এবারও তিনি পাঁচজন সহকর্মীকে নিয়ে সেখানেই ঈদ উদযাপন করবেন।

নির্জন বনে ঈদের নামাজ ও উদযাপনের চিত্র

কদমতলা ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম গত বছর ঈদের সময় পাতকোষ্টা টহল ফাঁড়িতে কর্মরত ছিলেন, যেখানে মুঠোফোনের নেটওয়ার্কও পাওয়া যায় না। তিনি জানান, ‘চাকুরির জন্য অনেক কিছুই মেনে নিতে হয়। আমার ছোট মেয়েটা ফোন করে প্রায়ই জানতে চায় আব্বু বাড়ি আসবা কবে। তখন কী বলব বুঝে উঠতে পারি না।’ ঈদের দিন পাঁচজন সহকর্মী মিলে একটি মুরগি জবাই করে সেমাই রান্না করে নিজেদের মতো করেই ঈদ উদযাপন করেছিলেন তারা।

বুড়িগোয়ালিনী ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, ‘পরিবার-পরিজন যখন ঈদের আনন্দে ব্যস্ত, তখন আমরা বনের নিরাপত্তায় টহলে থাকি। কয়েকজনকে ঈদের নামাজ পড়তে লোকালয়ে পাঠিয়ে দিয়ে আমরা টহল চালাই।’ পশ্চিম সুন্দরবনের মধ্যে পুষ্পকাটি, কলাগাছিয়া, দোবেকি, লাটাবেকি, কাছিঘাটা, হলদেবুনিয়া, মান্দারবাড়িয়াসহ ১৯টি টহল ফাঁড়ি রয়েছে, যেখানে মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক নেই এবং অনেক সময় ঈদের নামাজ পড়ার সুযোগও হয় না।

দায়িত্ব পালনে গর্ববোধ ও চ্যালেঞ্জ

সুন্দরবনের খুলনা অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, ‘ছুটির সময় দুর্বৃত্তরা বনের সম্পদ লুটপাট বা বন্য প্রাণী শিকারের সুযোগ নিতে পারে। এ কারণে ঈদের সময়ও সুন্দরবনের ভেতরের সব ফরেস্ট অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’ পরিবার থেকে দূরে নির্জন বনে দায়িত্ব পালন করলেও দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে পেরে গর্ববোধ করেন বনরক্ষীরা। তাদের কাছে সুন্দরবনের নিরাপত্তাই ঈদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয় কিভাবে বনরক্ষীরা ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে জাতীয় সম্পদ রক্ষায় নিবেদিত রয়েছেন। তাদের এই ত্যাগ ও দায়িত্ববোধ দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।