নবাবগঞ্জে কৃষিজমির মাটি কাটার অভিযোগ: পরিবেশ আইন লঙ্ঘন ও উর্বরতা হুমকি
ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে রাতের আঁধারে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়ার তীব্র অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ঈদ উৎসব ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে একটি চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, যারা খননযন্ত্র ব্যবহার করে ফসলি জমির মূল্যবান মাটি উত্তোলন করছে।
অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ
সরেজমিনে নবাবগঞ্জ উপজেলার নয়নশ্রী ইউনিয়নের ভূরাখালী এলাকায় দেখা গেছে, পরিবেশ আইন অমান্য করে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কাটা হচ্ছে। এসব মাটি পরে ট্রাকে করে বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে, যা জমির উর্বরতা নষ্ট করার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যও হুমকির মুখে ফেলছে।
স্থানীয় মানুষের দাবি অনুযায়ী, উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নেই দীর্ঘদিন ধরে রাতের আঁধারে মাটি কাটার ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে কৈলাইল, চুড়াইন, শোল্লা, বাহ্রা, শিকারীপাড়া, নয়নশ্রী ও বান্দুরা এলাকায় এই সমস্যা বেশি দেখা যাচ্ছে।
জমির উর্বরতা ও পরিবেশগত প্রভাব
কৃষিবিদ প্রদীপ সরকার সতর্ক করে বলেন, জমির উপরিভাগের চার থেকে ছয় ইঞ্চি গভীর মাটিতেই মূল পুষ্টিগুণ থাকে। এই স্তর কেটে নেওয়া হলে জমির উর্বরতা সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে কৃষকেরা অতিরিক্ত সার প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পান না, যা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
ভূরাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছাকাছি দুটি স্থানে সবুজ ফসলি জমির মাঝখানে খননযন্ত্র বসিয়ে সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন জানান, এতে আশপাশের জমিও ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা ভূমিধসের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ ও উদ্বেগ
স্থানীয় কৃষক আবজাল হোসেন অভিযোগ করেন, লিটন নামের এক ব্যক্তি এসব ফসলি জমির মাটি কাটছেন, এবং বারবার নিষেধ করলেও কেউ কথা শুনছে না। তিনি আরও বলেন, জমির মালিকেরা বাধ্য হয়ে জমি বিক্রি করছেন, যা এলাকার কৃষি ব্যবস্থাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
যন্ত্রাইল এলাকার বাসিন্দা সেন্টু মিয়া জানান, এসব মাটি সাধারণত ইটভাটায় সরবরাহ করা হয়, পাশাপাশি বিভিন্ন বসতবাড়ির ভরাটকাজেও বিক্রি করা হচ্ছে। এ ছাড়া, বান্দুরা ইউনিয়নের মহব্বতপুর গ্রামে পুরোনো একটি পুকুর সংস্কারের নাম করে রাতের আঁধারে মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ ও চ্যালেঞ্জ
নবাবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিলরুবা ইসলাম জানান, বিষয়টি ঠেকাতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। গত কয়েক দিনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে পাঁচজনকে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
তবে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দার অভিযোগ, প্রশাসন অভিযান চালিয়ে চলে গেলে কিছুদিন পর আবারও মাটি কাটা শুরু হয়। এতে ফসলি জমি ধীরে ধীরে গভীর খাদে পরিণত হচ্ছে, যা স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে পরিবেশ আইন মেনে চলা এবং কৃষিজমি রক্ষায় জোরালো পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয়রা, যাতে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন ও পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়।
