ঢাকার বায়ুদূষণ: স্বাভাবিক হয়ে উঠছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি
অন্য সব সকালের মতোই ছিল দিনটি। ঢাকার আকাশকে একেবারে স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল, ছিল হালকা কুয়াশাও। অন্যান্য দিনের মতো যানজটও ছিল প্রচুর। তবে সচরাচর মনে হওয়া সকালের আড়ালে উদ্বেগজনক কিছু ঘটছে ক্রমাগত। শহরের বাতাসের মান সূচক বা একিউআই শুধু বাড়ছেই না, এটি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় পরিণত হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বদলে যাচ্ছে দূষণের ধরন
সবশেষ কয়েক বছর ধরে ঢাকার বায়ুদূষণ যেন এক অনাকাঙ্ক্ষিত মৌসুমি অতিথির মতো আচরণ করেছে। শীতকালে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দেখা যায়, বর্ষায় কিছুটা সহনীয় হয়, আর মাঝের সময়গুলোতে প্রায় উপেক্ষিত থাকে। কিন্তু সম্প্রতি সেই ধরন বদলাতে শুরু করেছে আশঙ্কাজনকভাবে। বায়ুদূষণের মাত্রা এখন আরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী হচ্ছে, বাড়ছে তীব্র গতিতে। এমনকি বায়ুদূষণ এমন মাসগুলোতেও ঢুকে পড়ছে—যেগুলোতে একসময় কিছুটা স্বস্তির শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যেতো।
বাতাসের মান-সূচকের এই অবনতি শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়। একইসঙ্গে এটি একটি অর্থনৈতিক গল্প, একটি জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা এবং শাসনব্যবস্থার সক্ষমতার এক কঠিন পরীক্ষা। সব কিছু যেন এক ধুলোময় মেঘের ভেতরে গুটিয়ে আছে নীরবে।
সংখ্যাগুলোর নীরব সতর্কবার্তা
চলুন শুরু করি সেই সংখ্যাগুলো দিয়ে—যেগুলো নীরবে তীব্র সতর্ক বার্তা দিচ্ছে প্রতিদিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও নির্ধারিত বৈশ্বিক স্বাস্থ্যমান অনুযায়ী, বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম ধূলিকণা বা পিএম২.৫ এর মাঝারি মাত্রায়ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যানসার এবং শ্বাসযন্ত্রজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। ‘অদৃশ্য’ চালক হিসেবে কাজ করতে পারে বাতাসে থাকা এই সূক্ষ্ম ধূলিকণা। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, পিএম ২.৫ যদি প্রতি ঘনমিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম করে বাড়ে, তাহলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি গড়ে ১০ শতাংশ বেশি বেড়ে যায়।
নিয়মিতভাবে এমন দূষিত বাতাসেই শ্বাস নিচ্ছেন ঢাকার বাসিন্দারা, যা নিরাপদ হিসেবে ধরা মানের তুলনায় অনেক গুণ বেশি। প্রায়শই ঢাকার একিউআই সূচক ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে দেখা যাচ্ছে। এর জেরে ধূলিকণা জমতে থাকে মানুষের ফুসফুসে, বাড়তে থাকে হাসপাতালের বিল, হারায় কর্মক্ষমতা। বাতাসের মান সূচকের অবনতি স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন গবেষকরা।
মহামারি নয়, দূষণের প্রয়োজনে মাস্ক
ঢাকার রাস্তায় হাঁটলে অনেক মানুষ মাস্ক পরতে দেখা যায় নিয়মিত। এটি মহামারির কথা মনে করিয়ে দেয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে। ওই সময় মানুষেরা গণহারে মাস্ক পরিধান করতো সচেতনভাবে। তবে বর্তমান সময়ে মহামারি নয়, দূষণের প্রয়োজনে মাস্ক পরছে ঢাকার বাসিন্দারা।
বর্তমানে ঢাকার বাবা-মায়েরা সন্তানদের জন্য বাইরে খেলাধুলা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। অফিস কর্মীরা মাথাব্যথা ও গলা জ্বালাপোড়ার অভিযোগ করছে নিয়মিত, যেন এগুলো শুধু মৌসুমি সামান্য অসুবিধা। এই নীরব মানিয়ে নেওয়াটা বিপজ্জনক, কারণ স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া প্রায়ই উদাসীনতা তৈরি করে। যখন একটি সংকট দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
বাতাস খারাপ হওয়ার গভীর কারণ
ঢাকার বায়ুর মান খারাপ কেন হচ্ছে, এমন প্রশ্ন উঠলেই আসে তিনটি কারণ। সেগুলো হলো নির্মাণকাজের ধুলো, যানবাহনের ধোঁয়া ও ইটভাটার দূষণ। আসলেই কি এ তিন কারণে বায়ুর মান খারাপ হচ্ছে? উত্তর দিতে গেলে ‘না’ই আসবে। দূষণের কারণ রয়েছে অনেক গভীরে।
পরিবেশগত সুরক্ষা ব্যবস্থার তুলনায় অনেক দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে ঢাকা শহর। মেগা প্রকল্প, সড়ক খনন ও অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে দূষণে ভরা বাতাসে বিপুল পরিমাণ ধুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে। আর যানজট কার্বন নির্গমনকে ত্বরান্বিত করছে অবিরাম।
আবহাওয়ার ধরনও পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে। শুষ্ক মাসগুলোতে তাপমাত্রার উল্টো স্তরবিন্যাস দূষণকে মাটির কাছাকাছি আটকে রাখে। ফলে শহরটি যেন ভাসমান বিষাক্ত কণায় ভরা এক অগভীর বাটিতে পরিণত হয়। শক্তিশালী বাতাস বা বৃষ্টি না থাকলে এসব দূষণ ছড়িয়ে যেতে পারে না। বরং বাতাসে থেকেই যায়—আর বাসিন্দারা সেগুলোই শ্বাসের সঙ্গে নিতে থাকেন অনবরত।
নীতিগত গতি ও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি
এখানে একটি অস্বস্তিকর সত্য রয়েছে, ঢাকার বায়ুদূষণ সংকট শুধুমাত্র বাতাসে যা আছে তাতে নয়। এটি নীতিগত গতি বা কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতির বিষয়ও। পরিবেশগত বিষয়ে বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার করে আসছে বাংলাদেশ। ইটভাটা, যানবাহনসহ নির্মাণ ব্যবস্থাপনায় আইন তৈরি করেছে সরকার। তবে সেগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে অনেকাংশে। ঢাকার দূষণ নিয়ন্ত্রণ প্রায়ই যেন ‘ওয়্যাক-এ-মল’ খেলায় পরিণত হয়।
অর্থনৈতিক ক্ষতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
বায়ুদূষণ কি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করছে? দূষিত বাতাস শুধু স্বাস্থ্যজনিত বোঝা নয়, এটা মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে ক্রমাগত। শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে প্রায়শ, শিশুরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না, স্বাস্থ্য খাতে বেড়েছে ব্যয়। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ক্রমেই পরিবেশগত জীবনযাত্রার মানকে অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে ঢাকার পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে স্পষ্ট।
কী কী পরিবর্তন করা দরকার
ধুলো নিয়ন্ত্রণ কেবল প্রতীকী হিসেবে থাকতে পারবে না। সব বড় নির্মাণস্থলে বাধ্যতামূলক ধুলো নিঃসরণ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল কমপ্লায়েন্স পর্যবেক্ষণ থাকা উচিত। লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা যথেষ্ট বড় হতে হবে, যাতে মানুষের আচরণ পরিবর্তন হয়।
যানবাহনের কার্বন নির্গমন পরীক্ষার জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা সংস্কারের প্রয়োজন। যানবাহনের ফিটনেস প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই এবং প্রতারণা প্রতিরোধী হতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য প্রয়োগ ছাড়া মানদণ্ডের কোনও অর্থ থাকে না। ইটভাটায় প্রাচীন দূষণকারী পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার অপরিহার্য। ব্যবসায়ীদের এ নিয়ে উৎসাহ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জনগণের তথ্যস্বচ্ছতা। একিউআই সতর্ক বার্তা দেখে স্কুল ও কাজের সময় করা উচিত। এর আগে অনেক শহুরে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছে ঢাকা। এর গল্প হলো চাপের মধ্যে স্থিতিস্থাপকতার গল্প। কিন্তু বায়ুদূষণ একটি ভিন্ন ধরনের প্রতিপক্ষ—অদৃশ্য, ক্রমবর্ধমান এবং নির্মম এ প্রতিপক্ষ যানজট বা জলাবদ্ধতার মতো নয়, এর ক্ষতি মানুষের শরীরে জমে থাকে এবং ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়।
সুতরাং আজকের ক্রমবর্ধমান একিউআইকে কেবল আরেকটি খারাপ শিরোনাম হিসেবে নয়, বরং একটি প্রাথমিক সতর্ক বার্তা হিসেবে দেখা উচিত।
লেখক: গবেষণা সহযোগী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যাড মানেজমেন্ট (বিআইজিএম)