কক্সবাজারে পাহাড়খেকোদের দৌরাত্ম্য: প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ
কক্সবাজারে পাহাড়খেকোদের দৌরাত্ম্য: প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা

কক্সবাজারে পাহাড়খেকোদের দৌরাত্ম্য: প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ

কক্সবাজার জেলার পাহাড় ও টিলাগুলো একের পর এক ধ্বংস হয়ে চলেছে স্থানীয় দুর্বৃত্ত পাহাড়খেকোদের হাতে। নতুন নির্বাচিত সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সংসদীয় আসনেও এই অপরাধী চক্র আইনের কোনো তোয়াক্কা করছে না। এসব গোষ্ঠী এতটাই বেপরোয়া হয়ে পড়েছে যে একটি পাহাড় সম্পূর্ণভাবে কেটে সমতল বানিয়ে ফেলেছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশ্ন উঠছে, পাহাড়খেকোদের কাছে কি প্রশাসন ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষ আত্মসমর্পণ করেছে?

'আসমানের খুঁটি' পাহাড়ের নিশ্চিহ্ন হওয়া

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের জালিয়ারচাং এলাকার 'আসমানের খুঁটি' নামে পরিচিত একটি পাহাড় বহু বছরের পুরোনো প্রাকৃতিক সম্পদ। মাত্র দেড় মাসের মধ্যেই এই পাহাড় প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। খননযন্ত্রের আঘাতে পাহাড়টির এক-তৃতীয়াংশ কেটে সমতল করে ফেলা হয়েছে, যা প্রশাসনিক উদাসীনতা ও আইনের দুর্বল প্রয়োগের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

প্রতিবাদকারীদের হুমকি ও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, স্থানীয় লোকজন প্রতিবাদ করলেও তা গুরুত্ব পায়নি। উল্টো প্রতিবাদকারীরা প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন। বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, পাহাড়টি সংরক্ষিত বনের নয়; তাই তাঁদের করার কিছু নেই। এই বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ আইন স্পষ্টভাবে বলে যে ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও কোনো পাহাড় বা টিলা পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া কাটা যাবে না। আইন অনুযায়ী এটি দণ্ডনীয় অপরাধ, অর্থাৎ পাহাড়টি কার মালিকানায় সেটি এখানে মূল বিষয় নয়, বরং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার আইনের প্রয়োগই মুখ্য।

প্রশাসনের দেরিতে পদক্ষেপ ও স্থায়ী ক্ষতি

আমরা প্রায়ই দেখি, পাহাড় কাটার ঘটনা প্রকাশ্যে ঘটলেও প্রশাসনের পদক্ষেপ নেওয়া হয় অনেক দেরিতে। যখন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়, তখন কর্তৃপক্ষ 'খোঁজ নেওয়ার' কথা বলে। কিন্তু ততক্ষণে পাহাড় কেটে ফেলা হয়, গাছ উজাড় করে ফেলা হয়, এবং পরিবেশের ক্ষতি হয়ে যায় স্থায়ীভাবে, যা পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

দ্রুত ব্যবস্থা ও সমন্বয়ের আহ্বান

এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। শুধু শ্রমিক বা খননযন্ত্রের চালকদের নয়, পাহাড়ের মাটি বিক্রি করা মালিক এবং যাঁরা এ কাজে জড়িত—সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি কাটা পাহাড়ের ক্ষতি আংশিক হলেও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রশাসনের মধ্যে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। বন বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের ঘটনা সামনে এসে পড়ার পর নয়; বরং আগে থেকেই নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা থাকতে হবে। শুধু পেকুয়া নয়, গোটা কক্সবাজার জেলায় পাহাড় কাটা ও বন ধ্বংস বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে। এখানে কোনোভাবে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। সরকারের প্রতি আহ্বান, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ ও অবহেলাকারীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হোক।