সুন্দরবনে গোলপাতা আহরণ অনিশ্চিত: বড় নৌকার মাপ নিয়ে বন বিভাগের আপত্তি
সুন্দরবনে গোলপাতা আহরণ অনিশ্চিত: নৌকার মাপ নিয়ে আপত্তি

সুন্দরবনে গোলপাতা আহরণে অনিশ্চয়তা: নৌকার মাপ নিয়ে বন বিভাগের কঠোর অবস্থান

সুন্দরবনে গোলপাতা আহরণের মৌসুম ঘিরে উপকূলীয় এলাকায় প্রস্তুতি শেষ করেছিলেন বাওয়ালিরা। তবে নির্ধারিত মাপের চেয়ে বড় নৌকা হওয়ায় বন বিভাগ সুন্দরবনে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছে না। এই সিদ্ধান্তে গোলপাতা আহরণ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।

নৌকার মাপ নিয়ে বন বিভাগের আপত্তি

বন বিভাগের পরিকল্পনা ছিল ৩ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত গোলপাতা সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি নৌকা সর্বোচ্চ ১৮৬ কুইন্টাল বা প্রায় ৫০০ মণ গোলপাতা বহন করতে পারবে। অর্থাৎ, এক হাজার মণ ধারণক্ষমতার নৌকা পর্যন্ত অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিমাপ করে দেখা গেছে, প্রস্তুতিকৃত অধিকাংশ নৌকাই এই মাপের চেয়ে বড়।

খুলনা রেঞ্জের কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তা নাসির উদ্দীন বলেন, "আমি নিজে ফিতা দিয়ে প্রতিটি নৌকার মাপ নিয়েছি। প্রায় সব নৌকাই এক হাজার মণ ধারণক্ষমতার চেয়ে বড় পাওয়া গেছে। প্রতিটি নৌকার পরিমাপ ও ছবি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।"

বাওয়ালিদের আর্থিক ক্ষতি ও হতাশা

বাওয়ালি আবদুল গনি জানান, নৌকা মেরামত, মাঝি-শ্রমিক নিয়োগ ও অন্যান্য প্রস্তুতিতে কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তিনি বলেন, "গত বছর এই নৌকাতেই সুন্দরবনে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এখন বন বিভাগ বলছে নৌকা বড়, অনুমতি হবে না।"

সুন্দরবন বাওয়ালি ফেডারেশনের সভাপতি মীর কামরুজ্জামান দাবি করেন, প্রতিটি নৌকা প্রস্তুত করতে গড়ে প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে বাওয়ালিদের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকার বেশি। অনুমতি না পেলে অনেকেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।

বন বিভাগের যুক্তি: সুন্দরবন সুরক্ষা

বন বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অতীতে বড় নৌকায় অতিরিক্ত গোলপাতা বহন এবং মূল্যবান গাছের গুঁড়ি পাচারের মতো অনিয়ম দেখা গেছে। এসব ঠেকাতেই এবার নৌকার ধারণক্ষমতার সীমা কঠোরভাবে প্রয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, "আমরা আগেই বাওয়ালিদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছিলাম। এখন থেকে সুন্দরবন সুরক্ষায় নিয়মের বাইরে কিছুই করা হবে না।"

পরিবেশবাদীদের মতামত

পরিবেশবাদীরা সুন্দরবন রক্ষার স্বার্থে বন বিভাগের কঠোর অবস্থানের পক্ষে মত দিয়েছেন। নাগরিক সংগঠন ‘উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলন’-এর সভাপতি মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, "বনজীবীদের বনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হবে এবং তাঁদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করতে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। গুটিকয় বাওয়ালির স্বার্থ রক্ষার জন্য জাতীয় সম্পদ সুন্দরবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা যাবে না।"

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সুন্দরবন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. ইমরান আহমেদ জানান, প্রথমে বন বিভাগ এ বছর গোলপাতা আহরণ বন্ধ রাখার কথা ভেবেছিল। পরে বাওয়ালিদের অনুরোধে ৩ মার্চ থেকে ২৮ দিনের জন্য অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে শর্ত ছিল—নৌকার নির্ধারিত মাপ অবশ্যই মানতে হবে। তিনি বলেন, "অতীতে কী হয়েছে, সেটি বড় বিষয় নয়, এখন থেকে নিয়ম মেনে চললে একটি সিস্টেম দাঁড়িয়ে যাবে।"

এই অবস্থায়, সুন্দরবনের গোলপাতা আহরণ মৌসুমে বাওয়ালি ও বন বিভাগের মধ্যে সমঝোতা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত সমাধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।