কক্সবাজারে দেড় মাসে এক-তৃতীয়াংশ পাহাড় কেটে সমতল, ব্যক্তি মালিকানায়ও আইন লঙ্ঘন
দেড় মাস আগেও যেখানে একটি পাহাড় দাঁড়িয়ে ছিল, সেটি এখন অনেকটাই সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে। মাত্র দেড় মাসের মধ্যে পাহাড়টির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অংশ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। রাত-দিন দুটি এক্সক্যাভেটর বা খননযন্ত্র চালিয়ে আড়াই একর জায়গাজুড়ে থাকা এই পাহাড়টি কেটে সম্পূর্ণ সমতল বানিয়ে ফেলা হয়েছে।
জালিয়ারচাং এলাকায় পাহাড় কাটার চিত্র
এই ঘটনাটি ঘটেছে কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের জালিয়ারচাং এলাকায়। বিশাল এই পাহাড়টি স্থানীয় চার জনের একটি চক্র নিয়মিত কেটে নিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া (এবিসি) আঞ্চলিক মহাসড়কের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের পুরোনো ইউপি কার্যালয় থেকে পূর্ব দিকে ৮০০ মিটার গেলেই জালিয়ারচাং জামে মসজিদ অবস্থিত। মসজিদ থেকে হাতের বামে মাত্র দেড়শ মিটার দূরেই এই পাহাড় কাটার কাজ অব্যাহতভাবে চলছে।
বন বিভাগের বক্তব্য
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান এই বিষয়ে বলেন, ‘পাহাড়টি সংরক্ষিত বনের অংশ নয়। এটি সংরক্ষিত বন এলাকা থেকে প্রায় ২৯০ মিটার দূরে অবস্থিত। এই ক্ষেত্রে চোখের সামনে পাহাড় কাটা দেখলেও আমাদের হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ এটি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি। তবে এই বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদফতর বা স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের।’
পাহাড় কাটার পেছনের কারণ
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আমানউল্লাহ নামের এক ব্যক্তি স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে পাহাড়ের মাটি বিক্রি করেছেন। এরাই রাত-দিন ধরে খননযন্ত্র ব্যবহার করে পাহাড়টি ক্রমাগত কেটে সাবাড় করে ফেলছেন। এদের মধ্যে আবু তাহের নামের একজন সরাসরি পাহাড় কাটার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘পাহাড়টি সম্পূর্ণ ব্যক্তি মালিকানাধীন। বন বিভাগেরও কোনো অধিকার এখানে নেই। ব্যক্তি মালিকানাধীন পাহাড় বলেই আমরা কাটার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।’ পাহাড় না কাটতে আইনি বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে তিনি কোনো ধারণা নেই বলে জানান। তবে আমান উল্লাহ বর্তমানে প্রবাসে থাকায় তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি।
আইনগত দিক
ব্যক্তি মালিকানাধীন হলেও পাহাড় বা টিলা কাটা আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদফতরের পূর্বানুমতি বা ছাড়পত্র ছাড়া সরকারি, আধা সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন যেকোনো পাহাড় কাটা বা মোচন করা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এই আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
পেকুয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এস এম নুরুল আখতার নিলয় বলেন, ‘জালিয়ারচাংয়ের পাহাড় কাটার বিষয়টি আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি। পাহাড়টি বন বিভাগের অধীনস্থ নয়, এটি ব্যক্তি মালিকানাধীন। তবে অনুমতিবিহীনভাবে পাহাড় কাটার কোনো সুযোগ আইনত নেই। আমরা এই পাহাড় কাটার ঘটনায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
কক্সবাজার পরিবেশ অধিদফতরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জমির উদ্দিন বলেন, ‘পেকুয়ায় পাহাড় কাটার বিষয়টি আমাদের এখনো জানা ছিল না। তবে সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন যেকোনো পাহাড় কাটা সম্পূর্ণ অবৈধ। আমি এখনই বিষয়টি খতিয়ে দেখছি এবং দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’



