তিতাস নদে কচুরিপানা ও দখল-দূষণের চাপে অস্তিত্ব সংকট
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী তিতাস নদের চারপাশ ঘিরে ধরেছে কচুরিপানা। নদের পানি প্রায় সম্পূর্ণ ঢেকে গেছে এই কচুরিপানায়, যার ফলে মাঝিরা নৌকা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। নদের দুই তীরে অবৈধ দখল ও দূষণের চিত্র প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে। পশ্চিম পাড়ের অন্তত ২০ থেকে ৩০টি স্থানে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ জমে আছে, আর পূর্ব পাড়ের একাধিক অংশ বালু ফেলে ভরাট করা হয়েছে। এই দূষণ, দখল এবং কচুরিপানার চাপে নদের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন।
জেলা প্রশাসকের নৌকা পরিদর্শন ও সরেজমিন মূল্যায়ন
আজ সোমবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান নৌকায় করে তিতাস নদের প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকা পরিদর্শন করেন। শিমরাইলকান্দি মসজিদের ঘাট থেকে মেড্ডা শ্মশানঘাট পর্যন্ত এই পরিদর্শন নদ দূষণমুক্ত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। তাঁর সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, জেলা পুলিশসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনকালে কর্মকর্তারা নদের দুই পাড়ের দখলচিত্র, বাসাবাড়ি ও বাজারের আবর্জনায় পাড় ভরাট এবং পূর্ব তীরে বালু ফেলে ভরাটের দৃশ্য সরেজমিনে প্রত্যক্ষ করেন। জেলা প্রশাসক শারমিন আক্তার জাহান বলেন, "যেভাবে মানুষ ময়লা-আবর্জনা ফেলছে এবং বালু–মাটি ফেলে নদ দখলের চেষ্টা করছে, তা দুঃখজনক। এসব বন্ধে আগে সিএস নকশা অনুযায়ী নদের সীমানা নির্ধারণ করতে হবে।"
নদের অবৈধ দখল ও সমন্বিত প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা
জেলা প্রশাসক আরও উল্লেখ করেন, নদের দুই পাড়ে প্রচুর স্থাপনা দেখা গেছে, যার শতকরা ৯০ ভাগই নদের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, "তালিকা আছে শুনেছি, তবে তা যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি একটি মেগা কাজ।" বিআইডব্লিউটিএ যেভাবে বুড়িগঙ্গা নদের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে দুই পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করেছে, তিতাস নদেও একই ধরনের সমন্বিত প্রকল্প নেওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।
এক প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, নদের সীমানা নির্ধারণ, আবর্জনা অপসারণ এবং অবৈধ দখলদারদের তালিকা করা হবে। প্রয়োজনে আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে পূর্ব তীরে বালু ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বালু অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব বাস্তবায়ন হলে নদের নাব্যতা বাড়বে, স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরবে এবং নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিভিন্ন সংস্থার প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার প্রশাসক মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও দূষণমুক্ত করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নদ খননের বিষয়েও পরিকল্পনা আছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে চিঠি আসতে শুরু করেছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আকাশ দত্ত বলেন, অব্যবস্থাপনা ও দখলদারত্বের কারণে শহর অংশে নদের এই অবস্থা হয়েছে। ২০২৩ সালে নদের ১১০ কিলোমিটারের মধ্যে ৯০ কিলোমিটার খনন করা হয়, কিন্তু শহর অংশটি সমীক্ষার ভিত্তিতে খননের বাইরে রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, সমন্বিত প্রকল্পের মাধ্যমে শহর অংশটিকে কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিআইডব্লিউটিএর আশুগঞ্জ–ভৈরব নৌবন্দরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাহিদ হোসেন বলেন, নদের দখল ও দূষণ রোধে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নদের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। এই উদ্যোগগুলো সফল হলে তিতাস নদ তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে বলে স্থানীয়রা আশা করছেন।
