চট্টগ্রাম নগরে পুকুর ভরাট: হারিয়ে যাচ্ছে জলাধার, বাড়ছে পরিবেশ সংকট
চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন স্থানে নির্বিচারভাবে পুকুর ভরাট করা হচ্ছে, যা শহরের জলাধার কমিয়ে আনছে এবং পরিবেশগত সংকট তৈরি করছে। নগরের মধ্যম হালিশহর এলাকায় পুকুর ভরাট করে বসতঘর তৈরি করা হচ্ছে, যা শহরের চেনা ছবিকে বদলে দিচ্ছে। তুলা পুকুর বস্তি একসময় দুই একরের পুকুর ছিল, কিন্তু এখন সেখানে প্রায় ৩০০ ঘরে হাজারের বেশি মানুষের বসবাস। বাসিন্দা মোহাম্মদ ইমন বলেন, ‘ছোটবেলায় এই পুকুরে পানি দেখেছি, পরে ধীরে ধীরে ভরাট হয়ে গেল।’ প্রবীণ নুরুল ইসলামের স্মৃতিতে তুলা পুকুর জীবন্ত, যেখানে তিনি সাঁতার শিখেছেন।
জলাধার ভরাটের ইতিহাস ও প্রভাব
একাধিক গবেষণায় উল্লেখ আছে, ১৮২২ সালে খনন করা তুলা পুকুর ২০০০ সালের দিকে পুরোপুরি ভরাট হয়ে যায়। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এতে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তুলা পুকুর নয়, চট্টগ্রাম নগরের শত শত পুকুর, দিঘি, ডোবা হারিয়ে গেছে, যার ফলে পানি ধারণের জায়গা কমেছে এবং ভূগর্ভে পানি ঢোকার প্রাকৃতিক পথ বন্ধ হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, জলাধার হারানোর এই দীর্ঘ ইতিহাস আজকের পানি-সংকট, জলাবদ্ধতা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির বড় কারণ।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, জলাধার ভরাট করা অপরাধ এবং অবশিষ্ট জলাধার সংরক্ষণ জরুরি। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, চার দশকে নগর থেকে ২,৭৭৬টি জলাধার বিলীন হয়েছে। ওয়ার্ডভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৬ নম্বর পূর্ব ষোলশহর ওয়ার্ডে ২৭২টি, ২৪ নম্বর উত্তর আগ্রাবাদ ওয়ার্ডে ২২৮টি পুকুর ভরাট হয়েছে।
আইন ও বাস্তবতা
পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইনে পুকুর ভরাট নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ বলা হলেও, মাঠে প্রয়োগ দুর্বল। সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা ও গাফিলতির কারণে জলাধার ভরাট অব্যাহত রয়েছে। ২০১০ সালের পর পরিবেশ অধিদপ্তর কিছুটা সক্রিয় হয়েছে, কিন্তু তত দিনে বহু বড় জলাধার হারিয়ে গেছে। ঢাকায়ও জলাভূমি ২০ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে নেমেছে, যা বিআইপির গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষণা ও উদ্বেগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা অনুযায়ী, নগরে জলাধার প্রতিবছর গড়ে ১০ শতাংশ হারে কমছে। ১৯৮৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে জলাধারের সংখ্যা ১,৬০৫ থেকে ১,৩৫২-এ নেমেছে। গবেষক মোরশেদ হোসেন মোল্লা বলেন, ২০০০ থেকে ২০১০ সালে নতুন আবাসিক প্রকল্প দ্রুত গড়ে ওঠার সময় সবচেয়ে বেশি জলাধার ভরাট হয়েছে। সিডিএর উপ-প্রধান নগর–পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী বলেন, এখন জলাধার রক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জীবনযাত্রায় প্রভাব
জলাধার হারানো শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়, নিত্যদিনের জীবনযাপনেও প্রভাব ফেলছে। উত্তর পতেঙ্গার মুসলিমাবাদ এলাকায় ওয়াসার পানির লাইন নেই, ফলে বাসিন্দাদের পানি কিনতে হয়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. খোরশেদ বলেন, ‘মাসে গড়ে পাঁচ হাজার টাকার পানি কিনতে হয়।’ চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, নগরে এলাকাভেদে প্রতিবছর গড়ে ৬ ফুট করে পানির স্তর নিচে নামছে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও সমাধান
জলাধার ভরাটের ফলে জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্য সংকুচিত হচ্ছে। অধ্যাপক অলক পাল বলেন, চট্টগ্রামে জলাধার ভরাট চলতে থাকলে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক জলাধার টিকবে না। গবেষক ও বাসিন্দারা প্রস্তাব করেন, জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে একটি ‘কেন্দ্রীয় জলাধার সংরক্ষণ টাস্কফোর্স’ গঠন করা উচিত এবং অবশিষ্ট জলাধার গেজেটভুক্ত করে সংরক্ষণ করতে হবে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘নইলে চট্টগ্রামের জল, জলবায়ু, জীবন—সবই ঝুঁকির মুখে পড়বে।’
