সুইডিশ ব্যবসায়ী ইয়োহান এলিয়াসের আমাজন বন রক্ষার যুদ্ধ: চার লাখ একর জমি কিনে পরিবেশ বাঁচালেন
বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে শুধু গোলটেবিল বৈঠক ও বক্তৃতায় মগ্ন, তখন সুইডিশ মাল্টি-মিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী ইয়োহান এলিয়াস সরাসরি কাজে নামেন। তিনি আমাজনের চার লাখ একর জমি কিনে নিয়েছেন, যা আয়তনে প্রায় লন্ডন শহরের সমান। এলিয়াস 'হেড' ক্রীড়াসামগ্রী প্রতিষ্ঠানের সাবেক চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিত, কিন্তু এখন তাঁর পরিচয় পরিবেশ রক্ষাকারী হিসেবে। গার্ডিয়ান ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগ বিশ্বজুড়ে প্রশংসা ও বিতর্ক দুইই সৃষ্টি করেছে।
এলিয়াসের নাটকীয় সিদ্ধান্ত: বন রক্ষায় জমি কেনা
ঘটনার শুরু হয় যখন এলিয়াস জানতে পারেন, আমাজনের গভীরে মেদেইরা নদীর কাছে 'গেথাল' নামের এক কাঠ ব্যবসায়ী কোম্পানি বিশাল বনাঞ্চল ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছে। ২০০৫ সালে, এলিয়াস প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার খরচ করে ওই কোম্পানি এবং তাদের মালিকানাধীন চার লাখ একর বনভূমি কিনে নেন। চুক্তি সই হওয়ার পর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সব ধরনের গাছ কাটা বন্ধ করে দেন। এভাবে যে কোম্পানি এত দিন বন উজাড় করত, তা রাতারাতি বন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
এলিয়াস গার্ডিয়ান-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, 'আমি রাজনীতিবিদদের ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলেছিলাম। তাঁরা শুধু কথা বলেন; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। বুঝতে পারলাম, বন বাঁচাতে হলে আমাকেই জমিটা কিনে নিতে হবে।' তাঁর এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ ছিল জলবায়ু পরিবর্তন রোধ করা, কারণ আমাজন বন পৃথিবীর ফুসফুস হিসেবে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড শুষে নেয়।
'কুল আর্থ' প্রতিষ্ঠা: স্থায়ী সমাধানের পথ
শুধু জমি কিনে বন বাঁচানো সম্ভব নয়—এটা বুঝতে পেরে এলিয়াস এবং ব্রিটিশ এমপি ফ্র্যাঙ্ক ফিল্ড মিলে প্রতিষ্ঠা করেন 'কুল আর্থ' নামের একটি অলাভজনক সংস্থা। এই প্রতিষ্ঠান প্রচলিত এনজিওগুলোর চেয়ে আলাদা, কারণ এটি কোনো মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি আদিবাসী ও স্থানীয় গ্রামগুলোর সঙ্গে কাজ করে। শর্ত একটাই: গাছ কাটা যাবে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের স্কুল, হাসপাতাল, বিশুদ্ধ পানি, নৌকা ও ইন্টারনেটের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, বিনিময়ে তাঁরা বন রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। এলিয়াস বুঝতে পেরেছিলেন, বনের আসল মালিক আদিবাসীরাই, তাই 'কুল আর্থ' জমি কেনার বদলে স্থানীয়দের মালিকানা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
বাধা ও সমালোচনা: ব্রাজিল সরকারের বিরোধিতা
এলিয়াসের এই উদ্যোগ শুনতে রূপকথার মতো মনে হলেও বাস্তবে তাঁকে অনেক বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। ২০০৮ সালের দিকে ব্রাজিল কর্তৃপক্ষ তাঁর কোম্পানির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে, অভিযোগ করে একজন বিদেশি কেন ব্রাজিলের এত বিশাল অংশের মালিক হবেন। কিছু রাজনীতিবিদ এটিকে 'গ্রিন কলোনিয়ালিজম' বলে আখ্যায়িত করেন, দাবি করেন এলিয়াস পরিবেশ রক্ষার নামে খনিজ সম্পদ দখল করতে চাইছেন।
ব্রাজিলের পরিবেশ সংস্থা এইবিএএমএ একবার এলিয়াসের কোম্পানিকে জরিমানাও করেছিল, যদিও তিনি দাবি করেন কোনো নিয়ম ভাঙেননি এবং একটি গাছও কাটা হয়নি। শেষ পর্যন্ত, তাঁর সৎ উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয় এবং 'কুল আর্থ' তার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
এলিয়াসের উত্তরাধিকার: ব্যক্তি উদ্যোগের শক্তি
ইয়োহান এলিয়াসের এই ঘটনা প্রমাণ করে, রাষ্ট্র বা বড় সংস্থা যা করতে ব্যর্থ হচ্ছে, ব্যক্তি উদ্যোগে তা করা সম্ভব। গার্ডিয়ান ও বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, 'কুল আর্থ' যেসব এলাকায় কাজ করছে, সেখানে বন উজাড়ের হার আশপাশের এলাকার চেয়ে অনেক কম। এলিয়াসের দর্শন ছিল স্পষ্ট: গাছ বাঁচিয়ে রাখলে লাভ বেশি, এবং তিনি কার্বন ক্রেডিট মার্কেটের মাধ্যমে বনের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মেটাতে চেয়েছিলেন।
বর্তমানে, আমাজনের পাশাপাশি পেরু, কঙ্গো ও পাপুয়া নিউগিনির মতো দেশেও 'কুল আর্থ' কাজ করছে। এলিয়াসের চার লাখ একর জমি কেনার ঘটনাটি একটি প্রতীকী শুরু, যা দেখিয়েছে পরিবেশ রক্ষায় প্রচলিত পদ্ধতির বাইরেও কাজ করা যায়। যদিও সমালোচকরা একজন ধনীর হাতে এত সম্পদের মালিকানাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন, সমর্থকরা যুক্তি দেন যে সরকার দায়িত্ব পালন না করলে এলিয়াসের মতো ধনীদেরই এগিয়ে আসতে হবে।
২০০৬ সালে যখন এলিয়াস এই জমি কিনেছিলেন, অনেকেই তাঁকে পাগল ভেবেছিলেন; কিন্তু তিনি প্রমাণ করেছেন, অর্থ শুধু ভোগের জন্য নয়, পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার জন্যও ব্যবহার করা যায়।
